রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেওয়ার পর একাধিক হামলা ও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, রুশ সামরিক আগ্রাসন ও হামলার খবর পেয়ে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ শহর ছাড়তে শুরু করেছেন সেখানার বাসিন্দারা।

কিয়েভে জরুরি সাইরেন বাজানোর পর শহর ছেড়ে যেতে চাওয়া মানুষের গাড়ির ভিড় দেখা যায় সড়কে। যদিও ইউক্রেন প্রশাসন দেশটির বাসিন্দাদের শান্ত থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন।
পুতিনের ঘোষণার পর কিয়েভের আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনগুলোতে শহরের মানুষ আশ্রয় নেন। অনেকে বাসে করে শহর ছেড়ে যেতে উদ্যত হন।

এর আগে কিয়েভের অনেক এটিএম বুথের সামনে দীর্ঘ সারি দেখা যায়। তারা টাকা-পয়সা (ইউক্রেনীয় মুদ্রা রিভনিয়া) নিয়ে শহর ছাড়ার চেষ্টা করছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই কিয়েভের সড়কে অধিক পরিমাণ সামরিক উপস্থিতি দেখা যায়।

একজন পর্যটক বিবিসিকে বলেন, সরকার বিমান হামলার সাইরেন বাজানোর পর তাকে আবাসিক হোটেল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তাই ব্যাগ নিয়ে সড়কে বেরিয়ে পড়েন তিনি।

শুধু ওই পর্যটকই নন, তার মতো আরও অনেককে এভাবে শহর ছাড়তে দেখা গেছে। তাদের অনেকে জানান, এখন তারা কী করবেন, সেটা বুঝতে পারছেন না। তাদের অনেকে আবার কথা না বলে দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকেন।

শহরটির অনেক বাসিন্দা বিবিসিকে বলেছেন, কিয়েভে অনেকেই মোবাইল সংযোগ পাচ্ছেন না। তাদের অনেকে সুপার মার্কেটে আশ্রয় নিয়েছেন।

এর আগে মস্কোর স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা ৫৫ মিনিটে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে সেনা অভিযান চালানোর ঘোষণা দেন। এর কয়েক মিনিট পরই ইউক্রেনে বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই আতঙ্ক প্রকাশ করে মন্তব্য করেছেন যে, তারা বোমা থেকে সুরক্ষা পেতে আশ্রয়কেন্দ্র এবং বেজমেন্টে আশ্রয় নিচ্ছেন।

এর আগে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে ‘তীব্র বোমা হামলা’ শুরু করেছে রাশিয়া। কিয়েভের কাছে বরিস্পিল বিমানবন্দরসহ একাধিক বিমানবন্দরে এই হামলা চালানো হয়েছে।

রুশ বিমান হামলা প্রতিহত করতে ইউক্রেনের বিমান বাহিনী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বলে ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেন, দেশটির স্থাপনা ও সীমান্তরক্ষীদের ওপর রাশিয়া ক্ষেপণাস্ত হামলা চালিয়েছে। তবে তার দেশ এই হামলা প্রতিহত করবে।

জেলেনস্কি বলেন, আতঙ্কের কিছু নেই। আমরা শক্ত অবস্থানে আছি। আমরা যেকোনো কিছুর জন্য প্রস্তুত। আমরা সবাইকে প্রতিহত করব, কারণ আমরা ইউক্রেন।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, তারা ইউক্রেনের সেনা স্থাপনা, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বিমান বাহিনীর ওপর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সক্ষম অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম আরআইএ দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এমন খবর প্রকাশ করছে।

ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলে রাশিয়ার ‘সেনা অভিযান’ পরিচালনার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা গেছে। সেখানে থাকা ইউক্রেনের বাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহ্বানও জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট।

রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন ফক্স নিউজে নিজের মতামত জানিয়েছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

স্থানীয় সময় বুধবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে ট্রাম্প বলেন, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট থাকলে রাশিয়া এই আগ্রাসন চালাতে পারত না।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমার মনে হয় তিনি (পুতিন) কিছু একটা করে দরকষাকষি করতে চেয়েছিলেন। তারপর এটা শুধু খারাপের দিকে গেছে এবং শেষপর্যন্ত তিনি দুর্বলতাটা দেখতে পেয়েছেন’।

ট্রাম্প আরও বলেন, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে যে ‘দুর্বলতা’ দেখা দিয়েছে, সেটিও এই রুশ আক্রমণের জন্য আংশিক দায়ী।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট পুতিন একটি পূর্ব পরিকল্পিত যুদ্ধ শুরু করেছেন, যে কারণে বহু প্রাণহানি এবং মানুষের জীবনের ক্ষতি হবে। এই আক্রমণের ফলে যে মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ হবে, তার জন্য রাশিয়া একাই দায়ী’।

ওই সামরিক অভিযানের ঘোষণার পর প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে যুদ্ধ থামানোর আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস।

প্রসঙ্গত, চলতি সপ্তাহে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে স্বঘোষিত প্রজাতন্ত্র দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একই সঙ্গে সেখানে ‘শান্তি ফেরাতে’ সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেন। পুতিনের ঘোষণার পর সেখানে গোলাবর্ষণ আরও তীব্র হয়েছে।

‌পিএসএন/এমঅ‌াই