আগামী জাতীয় নির্বাচনে সর্বোচ্চ দেড়শ আসনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করার চিন্তা ছিল নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। এ জন্য ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকায় নতুন প্রায় দুই লাখের মতো ইভিএম কেনার প্রস্তাব দিয়েছিল ইসি। কিন্তু অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে ইভিএম কেনার এই প্রকল্পটি স্থগিত করায় দেড়শ আসনে ইভিএম ব্যবহার করার চিন্তা বাদ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

এখন নিজেদের সংরক্ষণে থাকা দেড় লাখ ইভিএমের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায় ইসি। এজন্য ইসির মোট দশটি অঞ্চলে সংরক্ষিত দেড় লাখ ইভিএমের মান যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এরইমধ্যে ৫ অঞ্চলের তথ্য ইসিতে জমা পড়েছে বলেও জানা গেছে।
নির্বাচন কমিশন সচিব জাহাংগীর আলম গত সোমবার (২৩ জানুয়ারি) ইভিএম প্রকল্প স্থগিতের কথা জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, কমিশনের হাতে যে ইভিএম আছে, আগামী নির্বাচনে সেগুলো ব্যবহার করা হবে। একইদিন নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান বলেছেন, আমাদের কাছে যে ইভিএম আছে সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।


নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ইসির কাছে এক লাখ ৫২ হাজারের মতো ইভিএম রয়েছে। এরমধ্যে অর্ধলক্ষাধিক রাখা আছে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে (বিএমটিএফ)। বাকিগুলো ১০টি নির্বাচনী অঞ্চলে মজুদ রয়েছে।

নতুন ইভিএম কেনার প্রকল্প নিয়ে দোলাচালের মধ্যেই ইসি তাদের সংরক্ষণে থাকা ইভিএমগুলো যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু করে। যেসব ইভিএমে ত্রুটি পাওয়া যাচ্ছে তা সরবারহকারী বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে (বিএমটিএফ) পাঠানো হচ্ছে।

ইসি বলছে, তাদের কাছে সংরক্ষিত ইভিএমের গুণগত মান যাচাই শেষে কতগুলো ব্যবহার করার মতো এবং কত আসনে ইভিএমে ভোট করা যাবে তা জানা যাবে।

কত আসনে ভোট ইভিএমে আর কত আসনে ব্যালট পেপারে হবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানাতে গিয়ে কমিশনার আনিছুর রহমান বলেন, ফেব্রুয়ারির ১ তারিখে কয়েকটি সংসদীয় আসনে উপ-নির্বাচন আছে। তারপর বসে কত আসনে ব্যালট আর কত আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পাঁচ বছর ধরে মাঠ পর্যায়ে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না করায় ২০-৩০ শতাংশ ইভিএমের প্যাকেট, ব্যাটারি, মনিটর, ইউপিএস, কন্ট্রোল ও ব্যালট ইউনিটের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

জানা গেছে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩০ শতাংশ বা প্রায় ২৮ হাজারের মতো ইভিএম সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারায় অকেজো বা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এর মধ্যে কিছু মেরামতযোগ্য।

সংরক্ষণে চরম অযত্ন ও অবহেলায় অনেকগুলো অকেজো হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতি প্রায় সব অঞ্চলেই। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত ভোটে প্রায়ই ইভিএম বিকল হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত বছরের সেপ্টেম্বরে শুধু রংপুর অঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর অঞ্চলে থাকা ১০ হাজার ৭৫৯টি ইভিএম সেটের মধ্যে ৪ হাজার ৭১২টি কিউসি উত্তীর্ণ। বাকি ৬ হাজার ৩৫টি ত্রুটিপূর্ণ। পাশাপাশি ১ হাজার ১২৩টির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ হারিয়ে গেছে বলেও ইসিতে দেওয়া তথ্যে উঠে এসেছে।

জানা গেছে, রংপুরসহ যেসব অঞ্চলের ইভিএমে ত্রুটি ধরা পড়েছে তার অধিকাংশ ইভিএমের প্যাকেট উইপোকায় খাওয়া, প্যাকেটের ভেতরে কন্ট্রোল ও ব্যালট ইউনিটসহ ব্যাটারি, মনিটর, ইউপিএস উইপোকা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংরক্ষণে চরম অযত্ন ও অবহেলায় অনেকগুলো অকেজো হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতি প্রায় সব অঞ্চলেই। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত ভোটে প্রায়ই ইভিএম বিকল হওয়ার ঘটনা ঘটছে।

অন্যদিকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সার্ভার স্টেশনগুলোতে ইভিএম স্তূপ করে রাখার খবর এর আগে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এমনভাবে রাখার কারণে অনেক ইভিএমের মনিটর ও ব্যালট ইউনিট নষ্ট হয়ে গেছে। যদিও বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর সংরক্ষণের জন্য গুদাম ভাড়া করতে ইসির মাঠ প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছিল।

দেশে যেভাবে ইভিএমের যাত্রা

২০১০ সাল থেকে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার শুরু হয়। এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন নির্বাচন কমিশন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার শুরু করলেও কোনো সংসদ নির্বাচনে ব্যবহার করেনি। পরবর্তী সময়ে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনও জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করেনি।

নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনে ছয়টি আসনে ইভিএমে ভোটগ্রহণ করে।

কত আসনে ইভিএমে ভোটের সক্ষমতা আছে ইসির?

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতি ৫০০ পুরুষ ভোটারের জন্য একটি ও প্রতি ৪০০ নারী ভোটারের জন্য একটি করে ভোটকক্ষ স্থাপন করা হয়। প্রতি দুই হাজার ৫০০ ভোটারের জন্য একটি করে ভোটকেন্দ্র করা হয়। দেশের সর্বশেষ ভোটারের হিসেবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটকক্ষ হবে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৮১টি। আর ভোটকেন্দ্র হবে ৪৫ হাজার ৩১৬টি। প্রতিটি কক্ষে একটি করে এবং প্রতিটি কেন্দ্রে একটি অতিরিক্ত ইভিএম রাখা হয়। এ হিসাবে আগামী সংসদ নির্বাচনে দুই লাখ ৯৯ হাজার ৬৯৭টি ইভিএমের দরকার হতো।

তবে এখন নির্বাচন কমিশনের হাতে যতগুলো ইভিএম আছে তা দিয়ে ৭০ থেকে ৮০টি আসনে ভোট করা সম্ভব বলে বিভিন্ন সময় একাধিক নির্বাচন কমিশনার দাবি করেছেন।

কমিশনার মো. আলমগীর এক বক্তব্যে ৭০-৮০টি আসনে ভোটগ্রহণ করার মতো ইভিএম ইসির কাছে বলে দাবি করলেও গত ২২ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশন (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০টি আসনে ইভিএমে নির্বাচনের সক্ষমতা আছে।