বিদেশে উচ্চ শিক্ষায় বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়ে কড়াকড়ি করছে অনেক ব্যাংক। ডলার সংকটে ব্যাংকগুলো এখন আর আগের মতো স্টুডেন্ট ফাইল খুলতে চাইছে না। এমনকি আগে খোলা ফাইলের বিপরীতে অর্থ পাঠাতেও যাচাই-বাছাই বাড়িয়েছে তারা। এতে বিপাকে পড়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ করেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিকার মিলছে না। অবশ্য ব্যাংকগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি, উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক ছাত্রছাত্রীদের ফাইল খোলা বন্ধ নেই। উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তা করা হচ্ছে।

উচ্চ শিক্ষায় বিদেশ যেতে ইচ্ছুকরা দেশের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ভর্তি, টিউশন, আবাসন ফিসহ বিভিন্ন খরচ পাঠান। এ জন্য ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের একটি ফাইল খুলতে হয়। বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন হয় এমন ব্যাংক শাখায় এটি খোলা যায়। ভর্তি প্রক্রিয়ার সময় বা তার পরে শিক্ষার্থী বা তাদের অভিভাবকরা ওই ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বিদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা দেন। সম্প্রতি এ ধরনের ফাইল খুলতে গিয়ে বা বিদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির অর্থ পাঠাতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

জানা গেছে, ডলার সাশ্রয়ের নানা পন্থা অবলম্বনের পরও সংকটের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রতিনিয়ত বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়তে হচ্ছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। গত বছরের আগস্টে যা ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ওপরে ছিল। এভাবে কমতে থাকলে রিজার্ভ ঝুঁকিতে পড়তে পারে- এমন আশঙ্কায় ব্যয় সংকোচনের নীতি নেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এলসি খোলায় কড়াকড়ির পাশাপাশি বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের ফাইল খোলাও সীমিত করেছে ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের অনেকে উচ্চতর শিক্ষার জন্য বাইরে যাচ্ছেন। এর বাইরে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, রাজনীতিক বা ব্যবসায়ীদের সন্তান লেখাপড়ার জন্য বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। কিছুদিন পর কেউ কেউ সন্তানের নামে সেখানে বাড়ি, গাড়ি বা অন্য সম্পদ কিনে দিচ্ছেন। নিজের চাকরি শেষে কিংবা মাঝেমধ্যে গিয়ে হয়তো তিনি সেখানে থাকছেন। সাম্প্রতিক এ রকম অনেক ঘটনা শোনা যাচ্ছে। এক পর্যায়ে তাঁরাও হয়তো সপরিবারে বাকি সব সম্পদ নিয়ে বাইরে চলে যাচ্ছেন। সন্তানের লেখাপড়ার খরচ বৈধ উপায়ে পাঠালেও সম্পদ কেনার অর্থ যাচ্ছে হুন্ডি কারবারিদের মাধ্যমে। প্রবাসী আয়ের পুরোটা দেশে না আসার একটি কারণ এটি। এসব কারণে ব্যাংকগুলো হয়তো কিছুটা সতর্ক হয়েছে।

সুইফট সিস্টেমের বাইরে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে ব্যাংক এশিয়া ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে বিদেশে অর্থ পাঠানো যায়। ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চুক্তি থাকায় দ্রুত ও সহজে অর্থ পৌঁছে যায়। জানতে চাইলে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাফর আলম সমকালকে বলেন, উচ্চতর শিক্ষার জন্য যাঁরা বাইরে যান, তাঁরাই পরবর্তী সময়ে আবার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে দেশে পাঠান। ফলে এ ক্ষেত্রে কোনো কড়াকড়ি তাঁরা করেননি। আগের নিয়মেই তাঁদের ব্যাংক স্টুডেন্ট ফাইল খোলাসহ অর্থ পাঠাচ্ছে। যেসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শিক্ষার্থীরা অর্থ নেন, তা এক খাতের জন্য নিয়ে অন্য খাতে ব্যবহারের সুযোগ নেই।

ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী বলেন, শিক্ষার্থী ফাইল খোলার আগে তাঁর ভর্তিসংক্রান্ত উপযুক্ত প্রমাণ দিতে হয়। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে টিউশন ফি, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য খরচ পাঠানো হয়। এক সেমিস্টার থেকে আরেক সেমিস্টারে উত্তীর্ণ হলেন কিনা, কোনো কারণে লেখাপড়া বন্ধ করেছেন কিনা- এসব নিশ্চিত হয়েই অর্থ পাঠানো হয়। ফলে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে কারও বাড়তি অর্থ নেওয়ার সুযোগ নেই। দেশের বাইরে কেউ বাড়ি-গাড়ি করলে, সেটা হয়ে থাকে অন্য উপায়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার সংকটের কারণে বিলাসবহুল বা তুলনামূলক কম প্রয়োজনীয় ২৭ ধরনের পণ্য আমদানিতে শতভাগ পর্যন্ত এলসি মার্জিন নির্ধারণ করেছে। ১০ লাখ ডলারের বেশি এলসি খোলার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনাপত্তি নিতে হচ্ছে। অনাপত্তি দিতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য পেয়েছে। এর পর ব্যাংকগুলোকে এসব অনিয়ম বন্ধে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডলার সংস্থান না করে এলসি খুলতে নিষেধ করা হয়েছে। একদিকে ডলার সংকট, অন্যদিকে কঠোর বার্তার কারণে আতঙ্কে অনেক ব্যাংক স্টুডেন্ট ফাইল খোলাও সীমিত করেছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, স্টুডেন্ট ফাইল খোলায় কড়াকড়ি কোনো সমাধান না। বরং যাঁর ছেলেমেয়ে বা যিনি বাইরে যাচ্ছেন তাঁর আয়ের সঙ্গে ব্যয় কতটা সংগতিপূর্ণ, সেটা যাচাই করতে হবে। ছেলেমেয়েকে যিনি বাইরে পড়াতে পাঠাচ্ছেন, তিনি হয়তো এমন কোনো চাকরি করেন, যা দিয়ে পাঠানো সম্ভব না। তাহলে বাকি অর্থ কীভাবে আসছে, যাচাই করা দরকার। কোনোভাবেই প্রকৃত উচ্চ শিক্ষার জন্য যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁদের বাধাগ্রস্ত করা যাবে না।
সরকারি টাকায় বিদেশ ভ্রমণ স্থগিত করে গত ৯ নভেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে কিংবা শিক্ষার্থীদের বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে নতুন কোনো নির্দেশনা দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এখন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা উপব্যবস্থাপনা পরিচালকরা বিদেশ যেতে চাইলে তাতে অনাপত্তি দেওয়া হচ্ছে না।

ডলার সাশ্রয়ে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। নানা বিধিনিষেধের ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এলসি খোলা কমেছে সাড়ে ৮ শতাংশের মতো। নতুন এলসি কমলেও একই সময়ে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি কমায় ডলার সংকট থেকেই যাচ্ছে। অন্য ক্ষেত্রে কড়াকড়ির ফলে অর্থ পাচারকারীদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে এখন প্রবাসী আয়। হুন্ডি কারবারিতে জড়িত সন্দেহে বিএফআইইউর নির্দেশনার আলোকে এরই মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার এজেন্টের এজেন্টশিপ বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের বেশিরভাগই এখন ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ না পাঠিয়ে হুন্ডির আশ্রয় নিচ্ছেন। জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধির সঙ্গে রেমিট্যান্সের মিল না থাকা, যা বড় কারণ। হুন্ডি ঠেকানোর সহজ কোনো উপায় নেই। সাধারণভাবে ব্যাংকের ঋণখেলাপি ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনীতিকরা অর্থ পাচার করেন। যতদিন পাচারের চাহিদা থাকবে হুন্ডি ততদিন চলবে। অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে অন্য যা কিছুই করা হোক, বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়বে না।

পিএসএন/এমঅ‌াই