২০১২ সালের দিকে টাঙ্গাইলের নাসির উদ্দিন বাবু ভালোবেসে একই এলাকার পারুল আক্তারকে বিয়ে করেন। পরিবার মেনে না নেওয়ায় পালিয়ে আশুলিয়ায় চলে যান তারা। এরপর ভালোই চলছিল সংসার। কিন্তু ২০১৫ সালের ১৯ জুলাই দিকে স্ত্রী তাকে কোনো কিছু না বলে বাসা থেকে বের হয়ে যান। এ ঘটনার কয়েক দিন পর পারুলের বাবা কুদ্দুস খাঁ বাদী হয়ে টাঙ্গাইলের কালিহাতি থানায় একটি অপরহণ এবং হত্যা করে গুমের অভিযোগে মামলা করেন।

সেই মামলা চলছিল। সবশেষ গত ডিসেম্বরে সাভার থানায় তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং যৌতুক আইনে আরেকটি মামলা হয়। সেই মামলায় তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। বাবু সাত বছর আগে তার স্ত্রী নিখোঁজ জানিয়ে সাভার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। সেই ডিজির কপির সাথে তিনি একটি অতিরিক্ত কাগজ তুলে দেন সেই কর্মকর্তাকে। সেই কাগজে থাকা একটি মোবাইল নম্বর দেখে সন্দেহ জাগে তদন্তকারী কর্মকর্তার।


আসলে এই ঘটনা সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। পারুলের বাবা ঠান্ডা মাথার খুনি। তিনি বারবার মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছেন। ফলে আসল অপরাধীকে বের করতে বেগ পেতে হয়েছে। কিন্তু মামলার তদন্তের এক পর্যায়ে একটি কাগজে পাওয়া ফোন নম্বর জট খুলে দিয়েছে। ফলে মামলা উল্টে যায়। বাদীই হয়ে যান প্রধান আসামি।
বিশ্বজিৎ বিশ্বাস, পিবিআই কর্মকর্তা
পরে জানা যায়, সেটি বাবুর নিখোঁজ স্ত্রী পারুলের বাবার। সন্দেহ আরও ঘনীভূত হতে থাকে। এবার পারুলের বাবাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তকারী নিজেই চমকে যান। যিনি এতদিন বাদী হয়ে মামলার পেছনে ছুটছেন, মেয়েকে অপহরণ করে হত্যাকারীর বিচার চাচ্ছেন, তিনিই হত্যাকারী!

গত সাত বছর ধরে চলা একটি অমীমাংসিত মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এভাবে হত্যাকারীকে খুঁজে পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) পিবিআই। এ ঘটনায় সম্প্রতি টাঙ্গাইল থেকে পারুলের বাবা কুদ্দুস খাঁ ও তার বন্ধু মোকাদ্দেস মণ্ডল ওরফে মোকা মণ্ডলকে গ্রেফতার করেছে পিবিআই। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।

পারুলের বাবা জানিয়েছেন, তিনি তার মেয়েকে হত্যার জন্য ৩০ হাজার টাকায় গ্রামের পাশের বন্ধু মোকা মণ্ডলকে ভাড়া করেছিলেন। দুই বন্ধু মিলে রাতের আঁধারে জয়পুরহাটের একটি নদীর ধারে নিয়ে ওড়না পেচিয়ে গলাটিপে হত্যা করেন নিজ মেয়েকে। হত্যার পর জামাইকে ফাঁসাতেই তিনি এমন অপহরণ মামলার নাটক সাজিয়েছিলেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পারুলকে অপহরণ করা হয়েছে দাবি করে তার বাবা কুদ্দুস খাঁ ২০১৫ সালে একটি মামলা করেন। সেই মামলায় তার বাবা নারাজি দেন। শেষবার নারাজি দিলে আদালতের সন্দেহ হয়। তারা সেটি আমলে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। পরে আদালত ঘটনাস্থল হিসেবে আরেকটি মামলার নির্দেশ দেন। সেই মামলা তদন্ত করতে গিয়েই রহস্য বেরিয়ে আসে।


পারুল, তার স্বামী ও বাবা। ছবি: সংগৃহীত
সবশেষ আশুলিয়ায় পারুলের বাবা করা মামলায় বাবুকে গ্রেফতারের পর পিবিআই জানতে পারে, তার স্ত্রী ২০১৫ সালে সাভারের বাসা থেকে বের হওয়ার সময় টাঙ্গাইলে গিয়েছিলেন। পরদিন বাসায় ফিরে বাবু তার স্ত্রীকে না পেয়ে মাত্র দুই ঘণ্টার মাথায় আশুলিয়া থানায় জিডি করেন। সেই ডিজির সূত্র ধরে সেই সময়কার তদন্তকারী কর্মকর্তা পারুলের ফোন নাম্বার ধরে কললিস্টের রেকর্ড সংগ্রহ করেছিলেন। তা ভাগ্যক্রমে তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছ থেকে সংগ্রহ করে নিজের কাছে রেখেছিলেন বাবু। সেটি তিনি এবার সরবরাহ করেন মামলার পিবিআইকে। তার দেওয়া কাগজের সূত্র ধরেই এ ঘটনার রহস্য উদঘাটন হয়।

একটি নম্বর ঘিরে যত রহস্য!

পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বাবু যে কাগজটি দিয়েছিলেন তাতে সাতটি ফোন নাম্বার ছিল। তাতে থাকা ছয়টির ব্যাপারে তথ্য জানা গেলেও একটি ছিল অজ্ঞাত, যার শেষ সংখ্যাটি ৩৭। সেটিকে নিয়েই সন্দেহ বাড়তে থাকে। নাম্বারটি কার তা জানার জন্য পারুলের বাবাসহ আত্মীয়-স্বজনদের ডাকা হয়। তারা কেউ সেই নাম্বারটি চিনে না বলে জানান। তাদের সাথে পারুলের কোনোদিন কথাও হয়নি। কিন্তু বাবা কুদ্দুস খাঁ জানান, তাকে প্রতি ঈদে মেয়ে ফোন দেন এবং কান্নাকাটি করেন। ফোনের অপর প্রান্ত থেক কিছুই বলেন না। এবার সেই কললিস্ট সংগ্রহ করে পিবিআই দেখতে পায়, নম্বরটি গত এক বছর ধরে গাইবান্ধা এলাকায় ব্যবহার করছেন এক নারী। তাতে পারুলের বোনের এক জামাই কথা বলেছেন। এবার পারুলের বাবাকে ডেকে নিয়ে জোরালো জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেন ফোন নাম্বারটি তার। সেই নাম্বারের পরিচয় পাওয়ার পর এবার তদন্ত মোড় নিতে শুরু করে।

কুদ্দুস খাঁ’র নাটক

অজ্ঞাত সেই ৩৭ নম্বর সম্পর্কে জানার পর এবার পারুলের বাবার কাছে পিবিআই জানতে চায় তার মেয়েকে কোথায় রেখেছেন তিনি। পিবিআইয়ের এমন প্রশ্ন শুনে তিনি একেকবার একেক ধরনের তথ্য দিতে থাকেন। একবার তিনি বলেন- তার মেয়েকে বন্ধু মোকা মণ্ডলের ভাতিজার সাথে বিয়ের জন্য দিয়ে এসেছিলেন। সাথে ৩০ হাজার টাকাও দেন। কিন্তু সেদিনের পর থেকে মেয়ের আর কোনো খোঁজ পাননি। এমন তথ্য পেয়ে তদন্তকারীরা ছুটে চলে যান টাঙ্গাইলের সেই প্রত্যন্ত গ্রামে। কুদ্দুসের তথ্যমতে মোকা মণ্ডল ধরা হলে তিনি স্বীকার করেন, কুদ্দুস তাদের মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছেন। আসলে তিনি মিথ্যা বলেছেন। আসল তথ্য তিনি নিজের মেয়েকে হত্যার জন্য ৩০ হাজার টাকা মোকা মণ্ডলকে দিয়েছিলেন। তার বিনিময়ে তিনি হত্যায় সহযোগিতা করেন।


মামলার আলামত ও হত্যাকাণ্ডে সহযোগী মকা মণ্ডল। ছবি: সংগৃহীত
পিবিআই জানায়, তারা টাঙ্গাইল থেকে ফিরে এসে কুদ্দুস খাঁর কাছে জানতে চান তার মেয়েকে কোথায় হত্যা করা হয়েছে। তিনি জানান, জয়পুরহাটে। এবার চলে হত্যার স্থান নির্ণয়ের পালা। দুই আসামিকে নিয়ে জয়পুরহাটে চলে যান কর্মকর্তারা। যে জায়গায় পারুলকে হত্যা করা হয়েছিল সেটি এখনও নির্জন এলাকা। পিবিআই সেখানে গিয়ে জানতে পারে, ২০১৫ সালে পারুলের লাশ উদ্ধার করে জয়পুরহাট সদর থানা পুলিশ অজ্ঞাত পরিচয় উল্লেখ করে একটি মামলা করে। সেই মামলা সিআইডি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয় যে, অজ্ঞাত পরিচয় লাশের সেই নারীকে হত্যা করা হয়েছিল। তবে তার পরিচয় ও হত্যাকারীকে শনাক্ত করতে পারেননি তারা।

নিজ মেয়েকে যেভাবে হত্যা করেন বাবা

পিবিআইয়ের কাছে কুদ্দুস খাঁ জানান, ২০১৫ সালে তার মেয়ে হঠাৎ একদিন তাকে ফোন করেন। ফোনে জানান, তিনি বাবুর সংসারে থাকবেন না। মেয়ের ফোন পেয়ে তাকে অন্যত্র বিয়ে দেবেন বলে জানান কুদ্দুস খাঁ। মেয়েও বাবার কথায় বিশ্বাস করে টাঙ্গাইল চলে যান। কিন্তু মেয়েকে বাড়িতে তোলেননি। তাকে পথেই নানা কিছু বুঝিয়ে বন্ধু মোকাদ্দেস মণ্ডল ওরফে মোকা মণ্ডলের কাছে নিয়ে যান। পরে তারা চলে যান জয়পুরহাটে। সেখানে যেতে রাত হওয়ায় পারুল ছিলেন ক্লান্ত। রাতের আঁধারে নদীর তীর ধরে হাঁটার সময় মেয়েকে হঠাৎ ধাক্কা মেরে ফেলে দেন বাবা কুদ্দুস খাঁ। পরে তিনি ও তার বন্ধু মিলে মেয়ের পরনের ওড়না দিয়ে হাত-পা বেঁধে তাকে গলাটিকে হত্যা করেন। শেষে লাশটি নদীতে ফেলে দেন। সেখান থেকে বাড়িতে ফেরার ট্রেন ধরতে না পারায় রাতে রেলওয়ে স্টেশনেই ছিলেন তারা। পরদিন বাড়িতে ফিরে এলেও স্ত্রী ও সন্তানকে কখনোই বিষয়টি জানাননি যে, তিনি পারুলকে খুন করেছেন। মেয়েকে হত্যা করে বাড়িতে এসে দুই দিন পর টিভি দেখে নিশ্চিত হন তার মেয়ের লাশ অজ্ঞাত পরিচয় হিসেবে পুলিশ উদ্ধার করেছে।

এই মামলার তদন্তকারী ও ঢাকা জেলার পিবিআইয়ের এসআই বিশ্বজিৎ বিশ্বাস বলেন, ‘আসলে এই ঘটনা সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। পারুলের বাবা ঠান্ডা মাথার খুনি। তিনি বারবার মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছেন। ফলে আসল অপরাধীকে বের করতে বেগ পেতে হয়েছে। কিন্তু মামলার তদন্তের এক পর্যায়ে একটি কাগজে পাওয়া ফোন নম্বর জট খুলে দিয়েছে। ফলে মামলা উল্টে যায়। বাদীই হয়ে যান প্রধান আসামি।’

এই পুরো সময়ে বাবুর গ্রামের লোকজন জানত তিনি ও পরিবার পারুলকে হত্যা করে গুম করেছেন। এখন সেই গ্রামের লোকজনের ভুল ভেঙেছে।