সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ করার চেষ্টা করাও অনুচিত। কেননা আল্লাহ মানুষের ওপর তার সাধ্যের বাইরে কোনো বিধান চাপিয়ে দেন না। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের ভার দেন না। ’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৮৬)

অতএব অতিরঞ্জিত কোনো কিছু না করে কোরআন-হাদিসে যতটুকু করার নির্দেশ রয়েছে ততটুকু করতে হবে।

তার অতিরিক্ত করাই বাড়াবাড়ি, যাকে বিদআত বলেও অভিহিত করা যায়। বাড়াবাড়ি পরিহার করে সাধ্যমতো আমল করার প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশ হলো, ‘আমল করতে থাকো, যা করা তোমার পক্ষে সম্ভব। কারণ যতক্ষণ না তোমরা ক্লান্ত হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর প্রতিদানও বন্ধ হবে না। আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল হলো আমলকারী যা ধারাবাহিকভাবে করে। ’ (বুখারি, হাদিস : ৪৩)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে প্রিয়তর আমল হচ্ছে যা অবিরতভাবে করা হয়ে থাকে, যদিও তা কম হয়। ’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৬৫)
আর আমল ততক্ষণ পর্যন্ত করতে হবে যতক্ষণ তা স্বাচ্ছন্দ্যে করা যায়। যেমন রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কাজ সে পরিমাণ গ্রহণ করবে, যে পরিমাণ তোমরা (সর্বদা) করতে সমর্থ হও। কেননা আল্লাহ কখনো সওয়াব দানে বিরক্তি বোধ করেন না, যাবৎ না তোমরা বিরক্ত হও। ’ (তিরিমিজি, হাদিস : ২৮৫৬)

রাতের নফল সালাত আদায়ের ক্ষেত্রেও যতক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন না হয়, ততক্ষণ সালাত আদায় করতে হবে। তন্দ্রা বা ঘুম এসে গেলে ঘুমিয়ে নিতে হবে। এ মর্মে হাদিসে এসেছে, আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ সালাত পড়ার সময় তন্দ্রাভিভূত হয়, তখন সে যেন শুয়ে পড়ে, যতক্ষণ না তার নিদ্রা দূর হয়। কেননা তোমাদের কেউ যখন তন্দ্রাবস্থায় সালাত পড়ে, তখন সে বলতে পারে না যে সে কি বলছে? হয়তো সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে গিয়ে নিজেকে গালি দিয়ে বসে। ’ (বুখারি, হাদিস : ২১২)

মানুষের শারীরিক শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী ইবাদত করতে হবে। সালাতের ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে না পাড়লে বসে আদায় করবে, বসে সক্ষম না হলে শুয়ে আদায় করবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি গ্রহণযোগ্য নয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করবে। যদি তাতে অসমর্থ হও বসে পড়বে। যদি তাতেও অসমর্থ হও তাহলে কাত হয়ে শুয়ে সালাত পড়বে। ’ (বুখারি, হাদিস : ১১১৭)

আর ইবাদতে বাড়াবাড়ি করা নাসারাদের বৈশিষ্ট্য। তারা ইবাদতে বাড়াবাড়ি করতে করতে বৈরাগ্যবাদ বা সন্ন্যাসবাদের উদ্ভব ঘটায়। বনে-জঙ্গলে, পর্বতের গুহায় জীবন-যাপন করা চালু করে। এসব মানবিক প্রবৃত্তিবিরুদ্ধ। এসব মানুষের জন্য দুঃসাধ্যও বটে। তাই ইসলামে এসব নিষিদ্ধ। কারণ মানুষ সাধ্যাতীত আমল করতে গিয়ে একসময় সে আমলহীন হয়ে পড়ে। এ জন্য ইসলাম মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ মানুষের প্রতি কঠিন কোনো বিধান আরোপ করেননি; বরং সহজ বিধান আরোপ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের প্রতি সহজ করতে চান, কঠোরতা আরোপ করতে চান না। ’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫)

ইবাদতে মধ্যপন্থা অবলম্বনের ক্ষেত্রে আরেকটি হাদিস বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, তিন ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর স্ত্রীদের কাছে এসে তাঁর ইবাদত সম্পর্কে জানতে চাইল। তাদের যখন ওই সম্পর্কে বলা হলো, তারা যেন তা কম মনে করল। তখন তারা বলল, রাসুল (সা.)-এর আমলের তুলনায় আমরা কোথায় পড়ে আছি? অথচ আল্লাহ তাঁর পূর্বাপর সব গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তখন তাদের একজন বলল, আমি সর্বদা সারা রাত সালাত আদায় করব। আরেকজন বলল, আমি সারা বছর সিয়াম পালন করব, কোনো দিন ছাড়ব না। অন্যজন বলল, আমি নারীসঙ্গ ত্যাগ করব, কোনো দিন বিবাহ করব না। ইতিমধ্যে রাসুল (সা.) এসে বলেন, তোমরা এরূপ এরূপ বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি। তথাপি আমি সিয়াম পালন করি, ছেড়েও দিই, আমি সালাত আদায় করি এবং ঘুমাই। আমি বিবাহও করেছি। সুতরাং যে আমার সুন্নতকে পরিত্যাগ করবে সে আমার দলভুক্ত নয়। ’ (বুখারি, হাদিস : ৫০৬৩)

আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা.) ইবাদত-বন্দেগিতে এমন মশগুল থাকতেন যে তাঁর স্ত্রীর প্রতি কর্তব্যও উপেক্ষিত হচ্ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ কথা জানতে পেরে বলেন, ‘হে আবদুল্লাহ, আমি কি শুনিনি যে তুমি সারা দিন সিয়াম পালন করো এবং সারা রাত সালাত আদায় করো? আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল! রাসুল (সা.) বললেন, এরূপ কোরো না। তুমি সিয়াম রাখবে আবার বিরতিও দেবে। সালাত আদায় করবে আবার ঘুমাবেও। কেননা তোমার ওপর তোমার শরীরের হক আছে, তোমার ওপর তোমার চোখের হক আছে, তেমনি তোমার ওপর তোমার স্ত্রীর দাবি আছে এবং তোমার ওপর অতিথিরও হক আছে। ’ (বুখারি, হাদিস : ১৯৭৫)