স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে দুটি রোগের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল। একটি স্ক্যাবিস অপরটি কনজাংকটিভা বা চোখের প্রদাহ। বহুল পরিচিতি রোগ দুটি আমাদের দেশে চুলকানি ও চোখ ওঠা নামে পরিচিত। এর মধ্যে চোখ ওঠা সমস্যাটি প্রতি বছরই একটি নির্দিষ্ট সময়ে ছড়াতে দেখা যায়। তবে এবছর হঠাৎ করেই রোগটির প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বিশেষত রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে রোগটির সংক্রমণ লক্ষ্য করা গেছে। শিশু থেকে বয়স্কদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগটি। এটাকে অবহেলা না করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী শেখ সিফাত নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘হঠাৎ করে চার দিন আগে চোখ জ্বালাপোড়া, চুলকানোর সমস্যা অনুভব করছিলাম। একই সঙ্গে চোখ থেকে পানি পড়ছিল। সেদিন রাতে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর লক্ষ্য করলাম, চোখের কোণায় অনেক বেশি ময়লা জমেছে। চোখের জ্বালা-পোড়ার পাশাপাশি ব্যথাও অনুভব করছিলাম। আয়নার সামনে যাওয়ার পর দেখি চোখ একদম লাল হয়ে গেছে এবং কিছুটা ফুলেও গেছে।’

কখনও কখনও এটি কর্নিয়াতে ছড়ায়, এতে কর্নিয়ার আলসার এমনকি অন্ধত্বের দিকে চলে যেতে পারে। এটিকে এত হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। একাধিক স্কুলে এ ধরনের ঘটনা দেখা দিলে স্বাস্থ্য বিভাগকে সতর্কতা জারি করতে হবে। প্রয়োজনে সেসব স্কুলে সাময়িক ছুটি দিতে হবে।
অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ, সংক্রমক রোগ বিশেষজ্ঞ
সংক্রমণ ও চিকিৎসার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আমার অপর এক রুমমেটের চোখ ওঠেছিল। সম্ভবত তার থেকেই আমার হয়েছে। চোখ ওঠার পর থেকেই রুমে সবসময় সানগ্লাস ব্যবহার করছি। বারবার হাত ধুয়েছি। চেষ্টা করছি যতটা সম্ভব চোখে না দেওয়ার। এখন অবস্থা অনেকটাই উন্নতির দিকে। তবে কোনো ওষুধ ব্যবহার করিনি। অন্য রুমমেটদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়ায়নি।’

আরও পড়ুন: চোখ ওঠা রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর একটি কিন্ডারগার্ডেনে শিক্ষক বলেন, গত এক সপ্তাহে তার একাধিক শিক্ষার্থীর চোখ উঠার সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্রথমে দুই একজনের মধ্যে দেখা দিলেও পরে ক্লাসের প্রায় সব শিক্ষার্থীর চোখ ওঠেছে। তারা চোখ ওঠা সব শিক্ষার্থীকে সানগ্লাস পরতে বলেছেন। প্রয়োজনে ছুটি নিতে বলেছেন। আক্রান্তদের বেশিরভাগই ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে গেছে বলে জানান এই শিক্ষক।

এদিকে চোখ ওঠাকে সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও অসতর্কতায় এই সমস্যায় মারাত্মক হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি কর্নিয়ার জটিল সমস্যা এবং অন্ধত্বের কারণ হতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।

আতঙ্ক নয়, সতর্ক হতে হবে

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের রোগী হাসপাতালের বহির্বিভাগে আসছে। এছাড়া আমাদের বরিশাল ও চট্টগ্রাম সেন্টার থেকেও চোখ ওঠার সমস্যা নিয়ে রোগী আসার তথ্য পেয়েছি। এটি একটি ভাইরাল ইনফেকশন। এতে আতঙ্কের কিছু নেই। তবে সবাকে সতর্ক হতে হবে।’

চোখ ওঠা সমস্যা নিজে থেকেই সুস্থ হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি একটি সেলফ কিউরিং ডিজিজ, তবে ওষুধ ব্যবহার করলে দ্রুত ভালো হয়। যদিও অনেক সময় এই ইনফেকশন চোখের কর্নিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। তাই চোখ উঠলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কর্নিয়ায় সংক্রমণ না ছড়ালে নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু যদি ছড়ায় সেক্ষেত্রে ভালো চিকিৎসার প্রয়োজন। চোখ ওঠার পর কেউ ঝাঁপসা দেখলে বুঝতে হবে কর্নিয়াতে ছড়িয়েছে। তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।