হুন্ডি ঠেকাতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিদেশ থেকে সরাসরি রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে সরকার। নতুন এ উদ্যোগ কার্যকর হলে দেশের মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানির অ্যাপস ব্যবহার করে বিদেশে বসে অর্থ পাঠাতে পারবেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সেবা অনেক আগেই চালু করা দরকার ছিল। আর প্রবাসীরা বলেছেন- বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো ও গ্রহণ প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে। একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় মূল্যও বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানান তারা।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জামালউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রবাসীদের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বৈধ পথে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা অনেক আগেই চালু করা উচিত ছিল। হুন্ডি ঠেকাতে যত দ্রুত সম্ভব মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স গ্রহণের অনুমতি দিতে হবে। ব্যাংকে টাকা পাঠাতে অনেক সমস্যা। খরচ বেশি। তাই মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানিগুলোকে রেমিট্যান্স সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই, কাতার, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসীরা হুন্ডির মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে হুন্ডির মাধ্যমে বা অবৈধ পথে বছরে ৭৫ হাজার কোটি টাকা দেশে আসে। এই পরিমাণ অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে বা বৈধ পথে আনা গেলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে। চলমান ডলার সংকটের কারণে যেসব বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তা কেটে যাবে।


সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আনার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক এই সেবা চালু করার অনুমতি দিলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা সহজেই দেশে প্রিয়জনের কাছে অর্থ পাঠাতে পারবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনদের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা অথবা ডিলারের মাধ্যমে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করবে। রেমিট্যান্সের অর্থ প্রবাসীদের দেওয়া বাংলাদেশের মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে জমা হবে। মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স সংগ্রহের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ, মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান নিজেরা সংগ্রহ করবে, নাকি ডিলারের মাধ্যমে করা হবে, সে বিষয়গুলো চূড়ান্ত হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিদেশে খাবার হোটেল, সুপারশপ, মুদিদোকানে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে বিকাশ, রকেটের মাধ্যমে পাঠানোর জন্য অর্থ সংগ্রহ করছেন হুন্ডি কারবারিরা। বিদেশ থেকে ডলার নিয়ে দেশে প্রবাসীদের আত্মীয়স্বজনের বিকাশ, রকেট ও নগদ নম্বরে টাকা জমা দেন হুন্ডি ব্যবসায়ীরা। অনেক সময় প্রবাসীদের বাসা থেকে ডলার সংগ্রহ করে দেশে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে টাকা। ফলে প্রবাসী আয়ের অনেক ডলার দেশে আসছে না।

এসব কিছু বিশ্লেষণ করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলমান ডলার সংকটের বিষয়টি সামনে রেখে যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশ ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যবস্থা করতে চায়। এ জন্য মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ, রকেট, উপায়, নগদসহ সব অপারেটরের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এদিকে বৈধ পথে বা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো আরও সহজ করার দাবি জানিয়েছেন প্রবাসীরা। সিঙ্গাপুরে কর্মরত মো. রেজাউর রহমান শামীম গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘প্রবাসীরা সব সময় ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে চান। এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোতে যাওয়ার পর যে পরিমাণ কাগজপত্রে সই করতে হয়, এতে একবার এক্সচেঞ্জ হাউসে গেলে দ্বিতীয়বার আর কেউ যেতে চান না। একই সমস্যা দেশেও। বিদেশ থেকে পাঠানো টাকা তুলতে গেলে কোথা থেকে টাকা পাঠিয়েছেন, বিদেশে কী কাজ করেন, টাকা দিয়ে কী করবেন এ ধরনের বহু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। আর হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানোর জন্য আমাদের কোথাও যেতে হয় না। শুধু ফোন করে বলার পর বাড়িতে টাকা পৌঁছে দিয়ে আসে।’ রেজাউর রহমান বলেন, বৈধ পথে বা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্য টাকা পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে হবে। হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানোর আরও একটি কারণ ডলারের রেট বেশি। ব্যাংকিং চ্যানেলের চেয়ে ৭-৮ টাকা বেশি দেন হুন্ডি ব্যবসায়ীরা। তাই ডলারের বিনিময় হারও বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি। বর্তমানে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য ডলার রেট ১০৭ টাকা, সঙ্গে ২ দশমিক ৫ শতাংশ সরকারি প্রণোদনা। অন্যদিকে হুন্ডিতে ডলার রেট প্রায় ১১৪-১১৫ টাকা। যে কারণে প্রবাসীরা হুন্ডিতেই বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। সরকারের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৮৭ জন শ্রমিক বিদেশে কাজ করতে গেছেন, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৩২ জন। চলতি বছর অক্টোবর পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে ৯০ হাজার শ্রমিক কাজের জন্য বিদেশে গেছেন। প্রবাসে যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা বাড়লেও আগের মাসের তুলনায় রেমিট্যান্স কমেছে অক্টোবর মাসে। অক্টোবরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১৫২ কোটি ডলার, যা আগের মাসের তুলনায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বা ১২ কোটি ডলার কম। সেপ্টেম্বরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন ১৬৪ কোটি ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ৩৪.৩ বিলিয়ন ডলার।

পিএসএন/এমঅ‌াই