♦ নিরাপত্তা ঝুঁকির সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ, বন ও পাহাড়
মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে বাংলাদেশে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকির সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে কক্সবাজারের পরিবেশ, বন ও পাহাড়। বিপদে অতিথি হিসেবে আশ্রয় দেওয়া রোহিঙ্গারা এখন বাংলাদেশের বোঝায় পরিণত হয়েছে। নানা ভূ-রাজনৈতিক জটিলতায় পাঁচ বছরেও অনিশ্চিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন।
রোহিঙ্গাদের ফেরাতে বাংলাদেশ অব্যাহতভাবে প্রচেষ্টা চালালেও ইউক্রেন এবং তাইওয়ান সংকটে আন্তর্জাতিক মহলে চাপা পড়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গা ইস্যু। প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হওয়ায় রোহিঙ্গারা হয়ে উঠছেন অপরাধপ্রবণ। কমেছে আন্তর্জাতিক সহায়তা। এতে আশ্রয় পাওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের ‘গলার কাঁটায়’।
গত ৩০ জুলাই মানব পাচার প্রতিরোধে জাতীয় পরামর্শক সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক এখন বাংলাদেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমাদের সম্পদ সীমিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও সহায়তা নিশ্চিত করছে। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে এই বাস্তুচ্যুত নাগরিকরা আমাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এজন্য বাংলাদেশ দ্রুতই মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন চায়।’ রোহিঙ্গা বিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের দেওয়া তথ্য মতে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার উপস্থিতি ছিল। কিন্তু ক্যাম্পগুলোতে প্রতি বছর ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শিশু জন্মগ্রহণ করছে। সেই হিসাবে চার বছরে ক্যাম্পে রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজারের মতো। গত চার বছরে রোহিঙ্গার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১২ লাখের বেশি। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর ৭ লাখ ৭৩ হাজার ৯৭২ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। এ বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ৯ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৩ জন।
এর আগে ২০১৬ সালে অক্টোবরে রাখাইন প্রদেশ থেকে পালিয়ে আসেন কমপক্ষে ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। জানা যায়, করোনা প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার আগে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সরব ছিল। চীনের নেতৃত্বে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকসহ প্রত্যাবাসনের রূপরেখাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু করোনা প্রাদুর্ভাব শুরু হলে ভাটা পড়ে প্রত্যাবাসন ইস্যুতে। করোনা সংকট কাটিয়ে বিশ্ব স্বাভাবিক হলে শুরু হয় প্রত্যাবাসনের আলোচনা। কিন্তু এ বছরের শুরুতে ইউক্রেন সংকট শুরু হলে আন্তর্জাতিক মহলের নজর চলে যায় ইউক্রেনের দিকে। ফলে কমে আসে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে চীন-তাইওয়ান সংকট। এতে এক প্রকার ভাটা পড়েছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যু। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহে ভাটা পরলেও থেমে নেই বাংলাদেশের তৎপরতা। কুটনীতির অংশ হিসেবে বিশে^র বিভিন্ন ফোরামে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি উত্থাপন করে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
কিন্তু রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা ক্রমাগত কমছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)’র মতে- ২০২১ সালে ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং পাঁচ লাখের বেশি বাংলাদেশি জনগণের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ৮৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের বেশি সহায়তা চাওয়া হয়। এখন পর্যন্ত মাত্র ৪৯ শতাংশ সহায়তা পাওয়া গেছে। এর আগে ২০২০ সালে রোহিঙ্গাদের জন্য প্রায় ৮৮ কোটি ডলার তহবিলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হলেও মেলে মাত্র ৬০ কোটি ডলার। ২০১৯ সালে ঘাটতি ছিল ২৮ কোটি মার্কিন ডলার, ২০১৮ সালে ঘাটতি ছিল ৩০ ডলার। সাবেক কূটনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যু বলতে গেলে এখন অনিশ্চিত যাত্রা। কখন কীভাবে রোহিঙ্গাদের পাঠানো হবে সেই বিষয়ে নেই কোনো রুট ম্যাপ। মিয়ানমার বিভিন্ন অজুহাতে প্রত্যাবাসন নিয়ে কালক্ষেপণ করছে। আন্তর্জাতিক এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে না পারলে আমার মনে হয় না দ্রুত সময়ের মধ্যে তা সমাধান হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এক সময় রোহিঙ্গা ইস্যু আন্তর্জাতিক মহলে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখলে থাকলেও এখন ইউক্রেন এবং তাইওয়ান নিয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। তাই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়টি চাপা পড়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।’
অপরাধে জড়াচ্ছে রোহিঙ্গারা : কক্সবাজারের ক্যাম্পে আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গারা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। আধিপত্য বজায় রাখতে ক্যাম্পগুলোতে তৈরি হয়েছে ছোট বড় শতাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ। তারা অপরাধ সাম্রাজ্য ধরে রাখতে তৈরি করেছে ব্লক ভিত্তিক বাহিনী। এসব গ্রুপে একেকটিতে সদস্য রয়েছে সর্বনিম্ন ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ পর্যন্ত। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, মানব পাচার, অপহরণসহ ১২ ধরনের অপরাধে জড়িত। সন্ত্রাসী গ্রুপ ছাড়াও ক্যাম্পে সক্রিয় রয়েছে জঙ্গি সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা), রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), ইসলামী মাহাজ এবং জমিউয়তুল মুজাহিদ্বীন।
১০ স্পটে গণহত্যা স্মরণে সভা : রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস পালন করতে যাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। আজ ২৫ আগস্ট সকালে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ১০ স্পটে স্মরণ সভা করবে রোহিঙ্গারা। এ সমাবেশ সফল করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং গোপন গ্রুপে প্রচারণাও শুরু করেছে রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের যে সব স্পটে গণহত্যা দিবস পালন করবে তার মধ্যে রয়েছে ক্যাম-১ই, ক্যাম্প-৩, ক্যাম্প-৭, ক্যাম্প-৮ই, ক্যাম্প-৯, ক্যাম্প-১৩, ক্যাম্প-১৫, ক্যাম্প-২০, ক্যাম্প-২১ এবং ক্যাম্প-২৬।
পিএসএন/এমআই
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত