পূর্ণিমার কারণে সৃষ্ট অস্বাভাবিক জোয়ারে খুলনার কয়রায় কপোতাক্ষ নদে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। গতকাল রবিবার নদের প্রায় ৫০০ ফুট বেড়িবাঁধ বিলীন হয়েছে। চট্টগ্রামের রাউজানে ছয়-সাতটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। রাস্তা-ঘাট, বাড়িঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা তলিয়ে গেছে।
সুন্দরবন উপকূলীয় জনপদ খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের চরামুখা গ্রামের খালের গোড়ার উত্তর পাশের এলাকায় কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধের ভাঙন প্রথম চোখে পড়ে স্থানীয় জেলে রফিকুল ইসলামের। তিনি বলেন, ভোর ৪টার দিকে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ভয়াবহ ভাঙনে বেড়িবাঁধের প্রায় ৫০০ ফুট নদে বিলীন হয়ে যায়। স্থানীয়রা বাঁধে ভাঙন দেখে সহায়-সম্পত্তির ক্ষতির আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। পার্শ্ববর্তী মসজিদের মাইকে গ্রামবাসীকে ঝুড়ি আর কোদাল নিয়ে বেড়িবাঁধে যেতে বলেন চরামুখা গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মো. মাসুদ রানা। এরপর এলাকার শতাধিক মানুষ সকাল থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ রক্ষায় ত্রিপল, প্লাস্টিকের বস্তায় মাটি-বালু ভরে, বাঁশ ও অন্যান্য গাছ দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন। কিন্তু দুপুরে জোয়ারের পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সব প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়।
স্থানীয় লোকজন জানায়, কয়রায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ১৪/১ নম্বর পোল্ডারের এই ভাঙনে প্রায় আড়াই হাজার বিঘার চিংড়ির ঘের ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া ইউনিয়নটির চরামুখা, ঘড়িলাল, সরদারপাড়া ও দক্ষিণ বেদকাশি গ্রামে নদীর লোনা পানি প্রবেশ করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার পরিবারের বসতভিটা।
পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী মশিউল আবেদীন বলেন, বাঁধটি যে পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, চাইলেও দ্রুত মেরামত সম্ভব নয়। নদীতে জোয়ারের তীব্রতা কমলে কাজ করা সম্ভব হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিমেষ বিশ্বাস জানিয়েছেন, প্লাবিত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের রাউজানের উরকিরচর ইউনিয়নে পাঁচ দিন ধরে প্লাবনে হাজার হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসম পানিতে তলিয়ে আছে ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম। বাদ যায়নি বাড়িঘর, স্কুল, মাদরাসা, রাস্তাঘাট, ক্লাব, মসজিদের আঙিনাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। গতকাল বিকেলে এ প্রতিবেদন লেখার সময়ও হালদা নদীর জোয়ারের পানিতে তলিয়ে ছিল উরকিরচরের বিভিন্ন গ্রাম।
ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. আবুল কাশেম হিরু বলেন, সওদাগরপাড়া, খলিফারঘোনা, বাড়িয়াঘোনা, উরকিরচরসহ বিভিন্ন এলাকার ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষের চলাচল উরকিরচর সড়কটি দিয়ে। প্রতিদিন শত শত গাড়িও যাতায়াত করে। কিন্তু হালদা নদীর জোয়ারের পানির প্লাবনে সড়কটিতে প্রতিদিন পাঁচ-সাত ঘণ্টা পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ থাকছে।
স্থানীয় লোকজন জানায়, নদীর পশ্চিম অংশ অর্থাৎ হাটহাজারী অংশে বাঁধ আছে। কিন্তু রাউজানের উরকিরচর অংশে কোনো বাঁধ না থাকায় পানির চাপ এই ইউনিয়নে পড়ছে। এই কারণে ইউনিয়নটি জোয়ারে প্লাবিত হচ্ছে। এলাকাবাসীর মতে, উরকিরচর সড়কটি তিন-চার ফুট উঁচু করার পাশাপাশি এখানে বেড়িবাঁধ দিতে হবে। অন্যথায় প্রতিবছরই বর্ষার পাশাপাশি জোয়ারের পানিতে ধুঁকতে হবে উরকিরচরবাসীকে।
গতকাল দুপুরে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ায় নোয়াখালীর হাতিয়ার নিঝুমদ্বীপে বন্দরটিলা ঘাট-নামারবাজার প্রধান সড়কটি তিন ফুট পানির নিছে তলিয়ে গেছে। ফলে ওই সড়কে চলাচলকারী যানবাহনগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে ঝুঁকি নিয়ে হেঁটে অনেকে নিঝুমদ্বীপের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করছে। গত কয়েক দিনে জোয়ারের পানি রাস্তার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ভেঙে গেছে প্রধান সড়কের অনেক জায়গা। জোয়ারের পানি নেমে গেলে দেখা যায় সড়কে বিশাল বিশাল গর্ত তৈরি হয়েছে।
পিএসএন/এমআই
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত