‘ও ভাই...যাইবেন? পোস্তগোলা, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্থান। আপা যাইবেন নাকি? বাংলাবাজা, কাউরাকান্দি, মঙ্গল মাঝির ঘাট’। এমন হাঁকডাক আর শোনা যায় না শিমুলিয়া বন্দর প্রান্তে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকেই মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়া ঘাটে কেবলই সুনশান নিরবতা। নেই তেমন কোলাহল। আগে ক্ষণে ক্ষণে ফেরির হুইসেল বেজে উঠলেও এখন তেমনটা নেই। নেই লঞ্চের হর্নও। ঘাটের পার্কিং ইয়ার্ডে পরিণত হয়েছে যানবাহন মেরামতের গ্যারেজে! তবে ঘাটজুড়ে এখন রয়ে গেছে পুরনো স্মৃতিচিহ্ন। ঘাটটিতে কনটেইনার টার্মিনাল করার চিন্তা করছে সরকার। এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ঘাটে আবারও কর্মচঞ্চলতা আসতে পারে, সেই আশায় বুক বেঁধে আছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, শিমুলিয়ায় ‘ইকোপার্ক’ নির্মাণে প্রকল্প নিয়েছিল নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। এই প্রকল্পের আওতায় রিভারক্রুজ (নদী ভ্রমণ), চরে অবকাশ যাপন কেন্দ্র, প্রাকৃতিক ওয়াকওয়ে ট্রেইল, নৌ-জাদুঘরসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা হবার কথা ছিল। তবে পরবর্তীতে এটি পরিবর্তন হয়। এখন শিমুলিয়া ঘাটকে একটা কনটেইনার টার্মিনাল করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। যার বাস্তবায়ন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সরেজমিনে দেখা যায়, শিমুলিয়া ফেরিঘাটে একসময় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পারাপার হতেন। স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরু হওয়ার পর থেকে হারিয়ে যায় ঘাটের সেই চিরচেনা জৌলুস। পদ্মায় দাপিয়ে বেড়ানো লঞ্চ, ফেরিগুলো অলস পড়ে আছে। ফাঁকা পড়ে আছে সারি সারি খাবারের দোকান। লঞ্চঘাটেও নেই যাত্রীদের চাপ। নৌরুটের সকল ব্যবস্থাপনা থাকলেও যাত্রী ও যানবাহনের অপেক্ষায় ফেরি, লঞ্চ ও স্পিডবোর্ড ঘাট।
দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সহজতর যোগাযোগের মাধ্যম হওয়াতে গত কয়েক দশক ধরে মাওয়া প্রান্তের এই অঞ্চল থেকে নৌপথে ৩টি মাধ্যমে যাত্রী ও যানবাহন পারাপার হতো। এরমধ্যে ছোট বড় মিলিয়ে ১৫ থেকে ১৮টি ফেরি চলাচল করত। এর জন্য ছিলো ৪টি ঘাট। ৩টি টার্মিনাল দিয়ে চলতো ৮০টির বেশি লঞ্চ। এর পাশাপাশি চার শতাধিক স্পিড বোট। আবার যাত্রীরা বিশেষ বিশেষ সময় জীবনে ঝুঁকি নিয়ে ট্রলার যোগে প্রমত্তা পদ্মা পাড়ি দিয়েছে।
তবে বর্তমানের চিত্র একেবারেই উল্টো। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পরে থেকেই বেশ কিছুদিন লঞ্চ সার্ভিস বন্ধ ছিল। বর্তমানে ৪টি লঞ্চের মাধ্যমে এই সার্ভিসটি সচল রাখা হয়েছে। যার মধ্যদিয়ে ৯৮ শতাংশই মোটরসাইকেল পারাপার হয়। বন্ধ হয়ে গেছে স্পিড বোটসহ ফেরি চলাচল। তবে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন রাখার জন্য তিনটি পার্কিং ইয়ার্ড পরিণত হয়েছে গাড়ি মেরামতের গ্যারেজে।
গত বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত সপ্তাহের এই কয়েকদিন শিমুলিয়া প্রান্তে মানুষের সমাগম ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ আসেন ঘুরতে। কেউবা আসেন ইলিশ খেতে। আবার দলেবেঁধে অনেকেই আসেন পিকনিক করতে।
ঘুরতে আসা পর্যটকরা শিমুলিয়া ঘাট থেকে ট্রলার যোগে পদ্মা ঘুরে বেড়ায়। পদ্মা সেতুকে অবলোকন করেন। ঘুরে দেখেন সদ্য বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি ভিওআইপিসহ ৩টি ফেরি ঘাট। জরাজীর্ণ স্পিড বোট টার্মিনাল ও নিস্প্রাণ ৪টি লঞ্চ টার্মিনাল।
লঞ্চঘাট এলাকার টং দোকানি মো. মাহাবুব বলেন, পুরনো চাকচিক্য কিছুই নেই। নামেই রয়ে গেছে ঘাটটি। এক সময় দুইজন মিলে ২৪ ঘন্টা বেচাকেনা করে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা ইনকাম করেছি। এখন নিজের চলতেই কষ্ট হচ্ছে। প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার টাকা বিক্রি করতেই হিমশিম খেতে হয়। আমার মতো ঘাটে একসময় শতশত দোকান ছিল। এখন হাতেগোনা কয়েটি দোকান রয়েছে। বর্তমানে ছুটির দিনগুলোতে মানুষ শিমুলিয়া ঘাটে শুধু ঘুরতে ও খেতে আসে। তবে শুনেছি এই ঘাট নিয়ে সরকারের বড় পরিকল্পনা আছে। কিছু হইলে মানুষের কর্মসংস্থান হবে। মানুষের সমাগম হবে। আমাদের ব্যবসা ভালো হবে। বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে।
লঞ্চঘাটের টিকিটম্যান রিপন শেখ বলেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর অনেক দিন লঞ্চ চলাচল বন্ধ ছিল। বর্তমানে ৪টি লঞ্চ চলাচল করছে। এক ঘন্টা পরপর লঞ্চ চলাচল করে। যাত্রী সংখ্যা নেই বললেই চলে। বর্তমানে সীমিত সংখ্যক মানুষ আর বেশিরভাগ মোটরসাইকেল পারাপার করা হয়। মোটরসাইকেলসহ জনপ্রতি বর্তমান ভাড়া ৪০০ টাকা। আর জনপ্রতি যাত্রী ভাড়া ৫৫ টাকা।
গাংচিল বাসের হেলপার সুমন বলেন, একটা সময় ছিলো, দুপুরে খাওয়ার সময় পেতাম না। ঘাটে এসে যাত্রী নামাতে নামাতেই আবার যাত্রী ভরে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করতাম। কত গাড়ি ছিল। এখন এই জায়গায় আসি গাড়ি নষ্ট হয়ে গেলে মেরামত করতে। গাড়ি পরিষ্কার করতে। কোনো যাত্রী নেই। ঢাকা থেকে দুই একজন মাওয়ার কথা বলে আসে তাও তাদের পদ্মা সেতুর টোলপ্লাজার সামনে নামিয়ে দিতে হয়।
ফেরি সার্ভিসের কর্মচারী মঞ্জুর শেখ বলেন, ফেরিগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যে কয়টা আছে সেগুলো খুবই পুরাতন। আমি ২০১৬ সালে মাওয়াতে এসেছি। এখনও আছি। এখন কর্মজীবন অবসরের মতো। তাই বসে বসে খাওয়া আরকি।
মঞ্জুর শেখ বলেন, ‘এখন ঘাট এলাকাটি পুরো ফাঁকা, কেউ আসে না খোঁজ নিতে। তবে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রচুর মানুষ আসে ঘুরতে। পদ্মা সেতু দেখতে ও পিকনিক করতে। শুনেছি এই এলাকাটি নিয়ে সরকারের বড় কিছু করার পরিকল্পনা রয়েছে। আর তা হলে ভালোই হবে। চাঞ্চল্য ফিরে আসবে এই বন্দরের।
শিমুলিয়া নদী বন্দরের (বন্দর ও পরিবহন) কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই শিমুলিয়া ঘাটে সকল কার্যক্রম স্থবির হয়ে যায়। বর্তমানে লঞ্চ চলছে ৪টি। স্পিডবোট চলাচল বন্ধ। ফেরি চলাচলতো আগে থেকেই বন্ধ। আমরা ইতিমধ্যে স্পিডবোট ঘাটটি অন্যত্র সরিয়ে ফেলেছি। কয়েকটি স্পিডবোট নদীতে চলে শুধু পর্যটকদের নিয়ে। তাছাড়া লঞ্চগুলো চলছে মোটরসাইকেল চলাচল করার জন্যই।
তিনি বলেন, শিমুলিয়া ঘাটটি ইকোপার্ক করার কথা ছিল। পরবর্তীতে এটি পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে শিমুলিয়া ঘাট এলাকার অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল পোর্ট করার জন্য কাজ চলছে। যা কেরানীগঞ্জের পানগাঁও আদলে হবে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এটির কার্যক্রম শুরু হবে। এই টার্মিনালে কনটেইনারগুলো চট্টগ্রামের টার্মিনালের মতো লোড আনলোডের ব্যবস্থা থাকবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত