করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বের অর্থনীতিই আজ বিপর্যস্ত। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এই অবস্থায়ও দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থানে ধরে রাখতে সরকার চেষ্টা করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এজন্য সবাইকে একটু কৃচ্ছ্বতা সাধনা করতে হবে। সবাইকে সাশ্রয়ী ও মিতব্যয়ী হতে হবে।
রোববার (৬ নভেম্বর) রাতে জাতীয় সংসদের ২০তম অধিবেশনের সমাপনীতে দেওয়া ভাষণে সংসদ নেতা এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক উন্নত দেশও আজ হিমশিম খাচ্ছে। সারা বিশ্বব্যাপী বিপর্যস্ত অবস্থা। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদেরও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলাফল ভোগ করতে হচ্ছে। সারা বিশ্বে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি মানুষের চাহিদা পূরণ করতে। তারপরও আমাদের ওপর চাপটা আসছে। সবকিছুতে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে গেছে। বাজেট দিয়ে দেশটাকে ভালোভাবে চালাচ্ছিলাম। বাজেটে ভর্তুকি রেখেছিলাম। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির কারণে চাহিদা বেড়েছে। জ্বালানি তেলসহ সবকিছুতে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে রিজার্ভেও।’
‘খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তার কিছু নেই’
খাদ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে অভয় দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। তারপরও আগামীতে যেন কোনো সমস্যা না হয় সেটা মাথায় রেখে আমরা আমদানিরও ব্যবস্থা রেখেছি। আমাদের দেশের মানুষের যেন কষ্ট না হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা খাদ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। করোনার সময় থেকে আমি আহ্বান জানাচ্ছি, এক ইঞ্চি জায়গাও যেন খালি না থাকে। আজও সেই আহ্বান আবার জানাচ্ছি। এক ইঞ্চি জমিও কেউ ফেলে রাখবেন না।’
এ সময় সরকারপ্রধান জানান, সরকার রফতানির কথাও ভাবছে। তবে যেসব দেশ রফতানি করে তারাই আজ বেশি সমস্যায় পড়েছে।
দেশবাসীকে মিতব্যয়ী ও সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্যদেরও বলবো, মানুষকে সচেতন করুন, অপচয় বন্ধ করতে বলুন। তাতে সাশ্রয় হবে।’
রিজার্ভ নিয়ে অভয় দিলেন প্রধানমন্ত্রী
জানুয়ারি থেকে যেন ডলারের সংকট কেটে যায় সেই ব্যবস্থা হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘রিজার্ভ নিয়ে এখন সবাই পারদর্শী। ১৯৯৬ সালে যখন আমরা প্রথমবার ক্ষমতায় আসি রিজার্ভ পেয়েছিলাম ২.১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমরা কিছুটা বাড়িয়েছিলাম। দ্বিতীয়বার যখন ২০০৯ সালে সরকারে আসি তখন রিজার্ভ ছিল ৫.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা তৃতীয় দফায় যখন ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসি তখন রিজার্ভ ছিল ১৭.৪৭ বিলিয়ন ডলার। আওয়ামী লীগ সরকারই পাঁচ থেকে ১৭ বিলিয়নে রিভার্জ উন্নীত করে। এরপর চতুর্থ দফায় ২০১৯ সালে ক্ষমতায় আসার সময় রিজার্ভ ছিল ৩২.০৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবশেষ গত ৩০ জুন রিজার্ভ ছিল ৪১.৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। করোনার সময় ৪৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। তখন অবশ্য আমদানি সীমিত ছিল। এজন্য খরচ কম ছিল। বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ যখন বাড়ল আমদানিও বাড়ল। আমদানি বাড়তে থাকায় রিজার্ভও কমতে থাকে। গত ৯ নভেম্বর ৩৫.৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রিজার্ভ ছিল।’
ডলার নিয়ে দেশবাসীকে অভয় দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখনও যে রিজার্ভ আছে তা দিয়ে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় নির্বাহ সম্ভব। এটা তিন মাসের থাকলেই যথেষ্ট। তবে আমরা কিন্তু বসে নেই। আজও এ ব্যাপারে মিটিং করেছি।’
এ সময় বিলাসী পণ্য বর্জনের আহ্বান জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আঙ্গুর-আপেল না খেলে কী হয়। আমড়াসহ দেশীয় কত ফল আছে। দামি গাড়িতে না চড়লে কী হয়।’
আরও পড়ুন: ‘যুদ্ধের কারণে সবকিছুর দাম বাড়ায় রিজার্ভ ব্যবহার করতে হচ্ছে’
ঋণের কারণে বাংলাদেশের সংকটে পড়ার কোনো আশঙ্কা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ কোনো দিন ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না।’ তবে সবাইকে কৃচ্ছ্বতা সাধন ও সাশ্রয়ী হতে হবে জানিয়ে তিনি জানান, ইংল্যান্ডের মতো অনেক উন্নত দেশও আজ বিদ্যুৎ রেশনিং করে দিচ্ছে। এজন্য বিদ্যুৎ ব্যবহারসহ সবকিছুতে অপচয় রোধ ও সাশ্রয়ী হতে আহ্বান জানান তিনি।
‘তারপরও বিএনপিকে ভোট দিলে করার কিছু নেই’
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বিএনপির সমালোচনা করে বলেন, ‘বিএনপির সংসদ সদস্যরা চলে গেল। থাকলে বলতাম, তারা কীভাবে মানুষকে হত্যা করেছে। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে পুড়িয়ে মেরেছে। এটা নাকি তাদের আন্দোলন। পাঁচ শতাধিক মারা গেছে। এই যাদের অবস্থা তাদের জনগণ ভোট দেবে? কত বীভৎস ঘটনা বিএনপি ঘটিয়েছে। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি তো আছেই। খালেদা কেন জেলে, দুর্নীতির জন্য সাজাপ্রাপ্ত।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজ অনেকে মানিলন্ডারিংয়ের কথা বলে। তারেক জিয়া তো মানিলন্ডারিং মামলাতেই সাজাপ্রাপ্ত। আমেরিকা থেকে এফবিআইর লোক এসে পর্যন্ত সাক্ষী দিয়ে গেছে। এটা ভুলে গেলে চলবে না। তারপরও মানুষ তাদের ভোট দিলে আমার কিছু করার নেই।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত