জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান, সংক্ষেপে নিটোর। দেশে দুর্ঘটনাজনিত আঘাতপ্রাপ্ত জটিল রোগীদের শেষ আশ্রয়স্থল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত এই হাসপাতালটি। পঙ্গু হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠাটিতে প্রতিদিন সারাদেশ থেকে শতাধিক রোগী আসেন। ২৪ ঘণ্টাই দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের আর্তনাদে ভারী থাকে এখানকার জরুরি বিভাগের পরিবেশ। স্বাভাবিক অবস্থাতে রোগীর চাপে হিমশিম খাওয়া হাসপাতালটির পরিস্থিতি ঈদ বা উৎসবে ভিন্নমাত্রা পায়। ফলে রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। আর রোগীদের সহ্য করতে হয় অবর্ণনীয় বিড়ম্বনা।
এই হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের বেশিরভাগকেই মাসের পর মাস অবস্থান করে চিকিৎসা নিতে হয়। ফলে এক হাজার শয্যার হাসপাতালটিতে সবসময় সিটের তুলনায় অধিক রোগী সেবা গ্রহণ করেন। এতে রোগীদের মেঝে এমনকি বেলকনিতে অবস্থান করতে দেখা যায়।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত গুরুতর আহত রোগীদের বেশিরভাগ সময়ই ভর্তি নেওয়া ছাড়া অন্য উপায় থাকে না। ফলে আসন সংখ্যার তুলনায় অধিক রোগীকে সেবা দিতে হয়। যেমন গত ঈদুল ফিতরের আগে ও পরের কথা জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাদের তথ্যমতে, এ সময়ে সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে প্রতিষ্ঠানটিতে এক হাজার ২৫০ জনেরও বেশি রোগী ভর্তি হন। এ অবস্থায় নিজেদের সক্ষমতার বাইরেও রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
রোগীর চাপ ও ভর্তি বিড়ম্বনা
সরেজমিনে দেখা যায়, দেশের সর্ববৃহৎ ও আধুনিক অর্থপেডিক হাসপাতালটিতে কোনো শয্যা খালি নেই। ঈদপরবর্তী সময়ে রোগীতে ঠাসা প্রতিটি ওয়ার্ড। শয্যা না পাওয়া রোগীদের স্থান হয়েছে ওয়ার্ডের মেঝে, ব্যালকনিতে এমনকি রোগীর স্বজনদের চলাচলের পথেও রোগীদের অবস্থান করতে দেখা গেছে। অপারেশন থিয়েটার, এক্সরেসহ বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনেও রোগী ও স্বজনদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ফলে দূর-দুরান্ত থেকে আসা তুলনামূলক কম মারাত্মক রোগীরা ভর্তি না হতে পেরে জরুরি বিভাগের সামনে অপেক্ষমাণ। অনেকে ভর্তি হতে না পেরে হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন।
নোয়াখালী থেকে আসা ট্রাকচালক নুরুল আমিন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমি গত ২২ এপ্রিল রাতে ট্রাক দুর্ঘটনায় আহত হই। এতে আমার বাম পা ভেঙে যায়। পরদিন এখানে আসার পর আমার পায়ে প্লাস্টার ও টানা দেওয়া হয়। সেদিন ভর্তি করা হলেও পরদিন আমাকে ১৪ দিনের জন্য রিলিজ দেওয়া হয়। এ সময় অবস্থার তেমন উন্নতি না হওয়ায় স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে পুনরায় হাসপাতালে আসি। তাদের কথামতে শুক্রবার এলেও তারা ভর্তি নেননি। একদিন অপেক্ষার পরেও এখন পর্যন্ত ভর্তি হতে পারিনি। হাসপাতালে কোনো বেড খালি নেই, বারান্দাও রোগীতে ভরপুর। আমার স্বজনরা এখনও চেষ্টা করে যাচ্ছেন।’
উত্তরবঙ্গ থেকে আনা রহিম-সখিনা (ছদ্মনাম) দম্পতিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেটে বসে থাকতে দেখা যায়। আর তাদের ছেলে বাবার ফাইল নিয়ে এক রুম থেকে অপর রুমে দৌড়াদৌড়ি করছেন। ঢাকা মেইলেকে তারা বলেন, গত প্রায় তিন মাস আগে গাছ থেকে পড়ে রহিম মিয়ার পা ভেঙে যায়। এলাকায় চিকিৎসা গ্রহণে তার অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় ঢাকায় এসেছেন। তবে সকালে এলেও দুপুর দুইটা পর্যন্ত তিনি ভর্তি হতে পারেননি। তার ছেলে ভর্তির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এ বছর ঈদে রোগীর চাপ কিছুটা বেশি। ইমার্জেন্সির দিকে গেলে আমাদেরই মন খারাপ হয়ে যায়। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের বেশিরভাগই ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী। যাদের বড় অংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার।
অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল গণি মোল্লা, পরিচালক, পঙ্গু হাসপাতাল
পি এস/এন আই
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত