
নতুন ধরনের রাজনীতির স্বপ্ন নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি—এনসিপি। কিন্তু যাত্রার শুরুর দিকেই দলটি নানা বিতর্ক ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে। সমর্থন পাওয়া রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বাড়ছে দূরত্ব। নিজস্ব অবস্থান নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। একাধিক নেতার মতে, এখনই কার্যকর কৌশল না নিলে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনীতি হুমকিতে পড়তে পারে।
সম্প্রতি টানা তি নদিনের আন্দোলনের পর সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে ‘নৃশংস গণহত্যা’র দায়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এই আন্দোলনের সূচনা এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলীয় নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর আহ্বানে হলেও, পুরো কর্মসূচি ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতা ঐক্য’র ব্যানারে পরিচালিত হয়। আন্দোলনে এনসিপির পাশাপাশি ছাত্রশিবিরসহ জুলাই অভ্যুত্থানের সমর্থনে থাকা প্রায় সব রাজনৈতিক শক্তি একত্রিত হয়েছিল। সেখান থেকেই তৈরি হয় বিরোধের বিস্ফোরণ।
আন্দোলনের সফল সমাপ্তির পরপরই এনসিপির উপদেষ্টা মাহফুজ আলম তার দুটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে এমন কিছু মন্তব্য করেন, যা আন্দোলনজুড়ে গড়ে ওঠা ঐক্যে ফাটল ধরায়। তার পোস্ট ঘিরে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে এনসিপি এবং তাদের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) নেতাদের মধ্যে চরম বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একে অপরকে অভিযুক্ত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে পাল্টাপাল্টি স্ট্যাটাস, পোস্ট ও মন্তব্য।
বিভাজনের রাজনীতি কেউ জেতাতে পারে না। আপনারা যেভাবে ফেসবুকে দলীয় বিভক্তি উসকে দিচ্ছেন, তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। হয় আপনারা নিজেরাই ফাঁদে পড়েছেন, নয়তো নিজেদের জন্য ফাঁদ তৈরি করছেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এনসিপির ভেতরে থেকে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন—আমরা কি সবাইকে শত্রু বানিয়ে ফেলছি? বিএনপি, জামায়াত, বাম, এমনকি ফ্যাসিবাদবিরোধী প্ল্যাটফর্মের শরিকদের সঙ্গেও কি সম্পর্ক ছিন্ন করা আমাদের জন্য রাজনৈতিক আত্মঘাত নয়? অনেকে বলছেন, আন্দোলনের কৃতিত্ব নিজেদের ঘাড়ে নিতে গিয়ে এনসিপি মিত্রদের বিশ্বাসভঙ্গ করেছে। কেউ কেউ আরও কড়া ভাষায় বলছেন, ‘এনসিপি যদি সরকার গঠন করেও, ৬ মাসও টিকবে না—কারণ রাজনৈতিক বোঝাপড়া, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা এবং শিষ্টাচারের ঘাটতি প্রকট।’
আন্দোলনের সময় ও পরবর্তীকালে কয়েকটি ঘটনা এই বিরোধকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিশেষ করে শাহবাগে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় কিছু বিতর্কিত মন্তব্য ও গোলাম আযমের নামে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ এনসিপির দিকে ছুঁড়ে দেয় কিছু গোষ্ঠী। এনসিপি এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিবিরপন্থীদের সঙ্গে এনসিপি এবং বাগছাস নেতাকর্মীদের কথার লড়াই প্রকাশ্যে চলে আসে।
এনসিপি-পন্থীরা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে জামায়াতের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করে বক্তব্য দিচ্ছেন। অন্যদিকে, শিবির-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনসিপি চেতনার রাজনীতি বিক্রি করে নতুন কিছু করার ভান করছে, কিন্তু ভেতরে তারা ভিন্ন উদ্দেশ্যে কাজ করছে। কেউ কেউ বলছেন, এনসিপি কোনো ‘পলিটিকাল লয়্যালটি’ বজায় রাখতে পারছে না—এই অবস্থায় দলটি স্থায়ীভাবে কোনো রাজনৈতিক জোটের ভরসা পাবে না।
দলটির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হচ্ছে। কেউ বলছেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের কেন্দ্রে যারা ছিল, তাদের আমরা দূরে ঠেলে দিচ্ছি। আমরা যদি সব পক্ষকে শত্রু বানাই, তাহলে আমাদের মিত্র হবে কে?’ অন্যরা বলছেন, ‘জাতীয় সংগীত ইস্যুতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এনসিপিকে টার্গেট করা হচ্ছে। যারা নিজেদের রাজনীতি দাঁড় করাতে পারেনি, তারাই এখন উসকানি দিচ্ছে।’
হাসনাতের ডাকে যারা মাঠে এসেছে তাদের দূরে ঠেলে দেওয়া ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেন একজন। ভোটের লড়াই নিয়ে বলা হয়, বাম কখনো এনসিপিকে ভোট দেবে না। এদের ফাঁদে পড়লে রাজনীতি শেষ। আর জাতীয় সংগীত বিরোধিতা করা ছেলেটি শিবিরের ছিল না। কিন্তু বাকের এর দায় শিবিরকে দেওয়ার চেষ্টা করবে? এটা হাসিনা স্টাইল মন্তব্য করে একজন বলেন, বাকের একেবারে সব শেষ করে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রধানের ভার নিতে পারছে না।
আমরা রাজপথে সফল হয়েছি, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হচ্ছি। কারণ, আমরা বন্ধুহীন হয়ে পড়ছি। ভোটের মাঠে বামরা আমাদের গ্রহণ করবে না, শিবিরের সঙ্গে সংঘাত করে ডানপন্থী ছাত্ররা আমাদের দিকে আসবে না। তাহলে আমাদের ভোটার কোথায়?
একজন মন্তব্য করেছেন, ‘আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়েছে, কিন্তু রাজনীতির মাঠে আমরা কে? এই প্রশ্ন এখন এনসিপিকে তাড়া করছে।’ আরেকজন বলেছেন, ‘জুলাই আন্দোলনের পক্ষে কথা না বলে ইতিহাসের পুরনো পাতায় ফিরে গিয়ে যারা গোলাম আযমের স্লোগান দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, তারা গণবিচার প্রক্রিয়া থামাতে চাচ্ছে।’
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সমন্বয়কারী আব্দুল হান্নান মাসুদ এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘বিভাজনের রাজনীতি কেউ জেতাতে পারে না। আপনারা যেভাবে ফেসবুকে দলীয় বিভক্তি উসকে দিচ্ছেন, তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। হয় আপনারা নিজেরাই ফাঁদে পড়েছেন, নয়তো নিজেদের জন্য ফাঁদ তৈরি করছেন।’
এই বিবৃতির সূত্র ধরে এনসিপির ভেতরেই আলোচনা শুরু হয়েছে—দলীয় বিবৃতি কি আদৌ সবাইকে নিয়ে হয়েছে? কেন আন্দোলনের কৃতিত্ব এককভাবে নেওয়া হলো? কেন পুরনো শত্রুদের প্ররোচনায় পড়ে রাজনীতির মূল প্রশ্নগুলো ভুলে গিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে ‘দলীয় লাইন’ নির্ধারণ করা হচ্ছে?
এক নেতা বলেন, ‘আমরা রাজপথে সফল হয়েছি, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হচ্ছি। কারণ, আমরা বন্ধুহীন হয়ে পড়ছি। ভোটের মাঠে বামরা আমাদের গ্রহণ করবে না, শিবিরের সঙ্গে সংঘাত করে ডানপন্থী ছাত্ররা আমাদের দিকে আসবে না। তাহলে আমাদের ভোটার কোথায়?’
সবশেষে, গোলাম আযমের নামে স্লোগান ও জাতীয় সংগীত বিতর্ক নিয়ে এনসিপি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়। এতে তারা স্পষ্টভাবে জানায়—সাম্প্রতিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া কোনো এনসিপি নেতা বা কর্মী জনমতের বিরুদ্ধে কোনো স্লোগান দেননি। একটি পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে আন্দোলনের ঐক্য নষ্ট করার চেষ্টা করছে। সেসব মন্তব্যের দায় এনসিপির নয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪—এই তিনটি সময়কাল বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা একাত্তরের গণহত্যায় অভিযুক্ত, তাদের উচিত তাদের রাজনৈতিক অবস্থান পুনঃব্যাখ্যা করা এবং ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখা।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত