
জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিকে অঞ্চলভিত্তিক, গবেষণানির্ভর ও প্রযুক্তিসমৃদ্ধ করতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এলএসটিডি প্রকল্প। খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার বয়ারভাঙ্গা গ্রামে প্রায় ১০০ একর জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে এই বিশেষায়িত ‘প্রযুক্তি গ্রাম’। যেখানে আধুনিক ধান চাষ, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, দক্ষ পানির ব্যবহার, রোগবালাই দমন ও কৃষি যন্ত্রপাতির সফল প্রয়োগের মাধ্যমে বদলে যাচ্ছে স্থানীয় কৃষির ভবিষ্যৎ।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ব্রি-তে বাস্তবায়িত হচ্ছে “নতুন ০৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণার উন্নয়ন (এলএসটিডি)” শীর্ষক প্রকল্প। এর আওতায় সারাদেশে ১৫টি প্রযুক্তি গ্রাম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যার অন্যতম লক্ষ্য গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে দ্রুত কৃষকের মাঠে পৌঁছে দেওয়া। বটিয়াঘাটার বয়ারভাঙ্গা প্রযুক্তি গ্রামে এর বাস্তব সুফল মিলছে। এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো ব্যতিক্রমধর্মী “রাইস গার্ডেন”, যেখানে ব্রি অবমুক্ত বোরো মৌসুমের মোট ৬১টি জাতের মধ্যে ৫৮টি জাতই একই মাঠে প্রদর্শন করা হয়েছে। এর ফলে কৃষকরা একই জমিতে বিভিন্ন জাতের বৃদ্ধি, ফলন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন।
গবেষণাগার ও মাঠের এই সমন্বিত কার্যক্রমে উচ্চফলনশীল ব্রি ধান১০০, ১০২, ১০৮, ১১৬ ও ১১৮-এর পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত পরিবেশের উপযোগী ব্রি ধান৬৭, ৯৭ ও ৯৯ জাতের দারুণ সম্ভাবনা দেখা গেছে। এছাড়া স্বাস্থ্যসচেতন রোগীদের জন্য ডায়াবেটিক রাইস ব্রি ধান১০৫, প্রিমিয়াম মানের সুগন্ধি ব্রি ধান১০৪ এবং ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী ব্রি ধান১১৪ কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের ঘেরভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থায় উচ্চ ফলনশীল ‘ব্রি হাইব্রিড ধান৮’ অত্যন্ত আশাব্যাঞ্জক ফলাফল দেখিয়েছে, যা অনুকূল ব্যবস্থাপনায় প্রতি শতকে এক মণেরও বেশি ফলন দিতে সক্ষম।
প্রযুক্তি গ্রামের আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইতোমধ্যে স্থানীয় কৃষকরা ব্যাপক লাভবান হচ্ছেন। এলাকার কৃষক দীপ্ত গোলদার জানান, মাত্র পাঁচ কাঠা জমি থেকে তিনি ১০ মণ ৫ কেজি ধান পেয়েছেন, উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় তার লাভও হয়েছে বেশি। আরেক কৃষক নারায়ণ বিশ্বাস বলেন, যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান রোপণ ও কর্তনের ফলে শ্রম, সময় এবং উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অন্যদিকে কৃষক সুবির বিশ্বাস জানান, প্রচলিত ইউরিয়ার পরিবর্তে এখানে নতুন উদ্ভাবিত বায়োকোটেড ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে তাদের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সারের খরচ সাশ্রয় হয়েছে এবং ধানের ফলনও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এলএসটিডি প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “প্রযুক্তি গ্রামের মূল লক্ষ্য হলো গবেষণার ফলাফলকে সরাসরি কৃষকের মাঠে প্রদর্শন করা। কৃষকরা যখন নিজের চোখে জাত ও প্রযুক্তির কার্যকারিতা দেখেন, তখন তা গ্রহণের হার বৃদ্ধি পায় এবং কৃষি আরও লাভজনক ও জলবায়ু সহনশীল হয়ে ওঠে। গবেষণা ও কৃষকের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করাই এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য।”
ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন খুলনার প্রধান ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সাজ্জাদুর রহমান জানান, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিতে লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। এসব প্রতিকূলতা মোকাবিলায় প্রযুক্তি গ্রামে সুষম সার, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং যান্ত্রিকীকরণের বাস্তব প্রয়োগ শেখানো হচ্ছে, যা কৃষির ঝুঁকি হ্রাস ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। খুলনার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিল্লাল হোসাইন বলেন, এটি গবেষক ও কৃষকের মধ্যে জ্ঞান বিনিময়ের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। এর মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস ও পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চার এক ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বটিয়াঘাটার এই সফল মডেলটি পর্যায়ক্রমে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত