
বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলায় জয়লাভ করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ড ফেডারেল আদালতের একটি জুরি বোর্ড সর্বসম্মতভাবে সোমবার (১৯ মে) এই রায় ঘোষণা করেছে।
রায়ে বলা হয়েছে, ওপেনএআই মানবকল্যাণের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে বাণিজ্যিক রূপ ধারণ করেছে বলে মাস্ক যে অভিযোগ এনেছিলেন, তার জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে দায়ী করা যাবে না। জুরি সদস্যরা দুই ঘণ্টারও কম সময় আলোচনা করে জানান, মাস্ক এই মামলাটি করতে অনেক বেশি দেরি করে ফেলেছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই বিচার প্রক্রিয়াটিকে প্রযুক্তি বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছিল। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ এবং এর বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণের অধিকার কার হাতে থাকবে সেই প্রশ্ন। এই রায়ের পর ওপেনএআইয়ের শেয়ার বাজারে যাওয়ার (আইপিও) পথ অনেকটাই পরিষ্কার হলো। ধারণা করা হচ্ছে, আইপিও-তে গেলে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
তবে আইনি লড়াইয়ে জিতলেও ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের ব্যক্তিগত সুনামে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বিচার চলাকালীন আদালতের একাধিক সাক্ষী অল্টম্যানকে একজন ‘মিথ্যাবাদী’ এবং ‘অসৎ’ মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
এদিকে রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ইলন মাস্ক জানিয়েছেন, তিনি উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মাস্ক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘স্যাম অল্টম্যান এবং গ্রেগ ব্রকম্যান মূলত একটি দাতব্য সংস্থাকে চুরি করে নিজেদের পকেট ভারী করেছেন। আমেরিকার দাতব্য খাতে লুণ্ঠনের এই ধরনের নজির তৈরি হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।’
অবশ্য মামলার বিচারক ইভন গনজালেজ রজার্স বলেছেন, আপিলেও মাস্কের জেতার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ আইনিভাবে মামলা করার নির্দিষ্ট সময়সীমা (স্ট্যাটিউট অব লিমিটেশনস) মাস্ক আগে পার করে ফেলেছেন। জুরির সিদ্ধান্তের পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ দেখে নিজেই মামলাটি সরাসরি খারিজ করে দেওয়ার কথা ভাবেন এই বিচারক।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালে স্যাম অল্টম্যান, ইলন মাস্ক এবং আরও কয়েকজন মিলে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ওপেনএআই গঠন করেন। মাস্ক ২০১৮ সালে এর পরিচালনা পর্ষদ ত্যাগ করেন। মাস্কের অভিযোগ, তাকে ফুসলিয়ে শুরুতে ৩৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করানো হয়েছিল। কিন্তু পরে তার অজান্তেই অলাভজনক কাঠামোর আড়ালে একটি লাভজনক কোম্পানি খুলে মাইক্রোসফটসহ বড় বড় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে শত শত কোটি ডলারের ফান্ড নেওয়া হয়।
মাস্ক এরপর থেকে নিজের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্টার্টআপ এক্সএআই প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা এখন তার স্পেসএক্স রকেট ও স্যাটেলাইট কোম্পানির একটি অংশ।
Trump-called-off-attack-on-Iran
ইরানে হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করলেন ট্রাম্প, চলছে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা
মাস্কের আইনজীবীদের দাবি, এই রায় সিলিকন ভ্যালিতে একটি খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করবে। কারণ এই প্রক্রিয়ায় অলাভজনক সংস্থার নামে শুরু করে পরে কর্মকর্তারা ব্যবসা করে নিজেরা কোটিপতি বনে যাবেন।
পাল্টা যুক্তিতে ওপেনএআইয়ের আইনজীবীরা বলেন, মাস্ক নিজেই আসলে ব্যবসায়িক স্বার্থে এবং একটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানকে (এক্সএআই) সুবিধা দিতে এই ভণ্ডামি ছড়াচ্ছেন। ওপেনএআই যে বাণিজ্যিক রূপ নিচ্ছে, তা মাস্ক বহু বছর আগেই জানতেন। কিন্তু আইন অনুযায়ী তিন বছরের মধ্যে মামলা না করে তিনি ২০২৪ সালের আগস্টে এসে এই ভিত্তিহীন মামলাটি করেছেন।
ওপেনএআইয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটও এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। কোম্পানিটি জানায়, ওপেনএআইয়ের সঙ্গে এই প্রযুক্তির উন্নয়নে তারা ইতোমধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচ করেছে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সাংবাদিকতা থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। এর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়েও বিতর্ক চলমান। আদালতে মাস্কের আইনজীবীরা অল্টম্যানের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত জুরি বোর্ড তা আমলে নেয়নি। এই জয়ের ফলে স্যাম অল্টম্যানের নেতৃত্ব সাময়িক প্রশ্নের মুখে পড়লেও ওপেনএআই বিশ্ববাজারে তাদের আধিপত্য বিস্তারের দৌড়ে আরও একধাপ এগিয়ে গেল।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত