মতিঝিলের ক্লাবপাড়া, দেশের বিখ্যাত অনেক কিংবদন্তী ফুটবলার আর কাবাডি খেলোয়াড়দের অনেকেই ক্যারিয়ারের ভিত গড়েছিলেন এখানে। যারা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কাঁপিয়েছেন বিদেশের খেলার মাঠ। সব মিলিয়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের ঐতিহ্য আর অর্জনে ক্লাবগুলোর ছিলো সোনালী অতীত। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, তবে ২০১৯ সালের দিকে এসে ক্লাবগুলোর ওই ঐহিত্য আর অর্জনের যেন ‘ভরাডুবি’ হয়।
ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ক্যাসিনো চালানোর খবরে ক্লাবপাড়ায় অভিযান চালিয়ে একযোগে ছয়টি ক্লাব সিলগালা করে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর থেকেই ক্লাবপাড়ায় ‘ঘোর অন্ধকার’। ওই অভিযানের চার বছর হতে চলেছে। কী হাল বন্ধ থাকা ওই ক্লাবগুলোর, ক্লবাপাড়ারই বা পরিবেশ এখন কেমন? এসব নিয়ে সরেজমিন ঘুরে ক্লাবপাড়ার হালচাল জানাচ্ছেন ঢাকা মেইলের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মোস্তফা ইমরুল কায়েস। আজ দেখুন শেষ পর্বে—
দরজায় তালা ঝুলছে। জং ধরেছে তালা ও লোহার গেটের বিভিন্ন অংশে। ভেতরে জন্মেছে আগাছা। সবকিছু মিলে অন্যরকম এক পরিবেশ। গত চার বছর ধরেই এমনভাবে পড়ে আছে মতিঝিল ক্লাবপাড়ার ছয় ক্লাব। যেগুলোতে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছিল। ওই অপকর্মের কারণে বন্ধ হয়ে যায় ক্লাবগুলো। তখন থেকে আর খোলেনি। সহসাই আবার ক্লাবগুলো খুলবে কিনা তাও সংশ্লিষ্টরা বলতে পারছেন না। ফলে ক্লাবগুলোর ভবিষ্যত কী হবে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশ বলছে, মামলা চলমান আছে। ফলে মামলার কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্লাবগুলো বন্ধই থাকবে। এ বিষয়ে ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের ডিসি হায়াতুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে আদালতে। যেহুতু ক্লাবগুলোর নামে মামলা রয়েছে, তাই এখন সেগুলো খুলে দেওয়ার মতো অবস্থা নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্লাবগুলো বন্ধ থাকায় ভেতরে কোনো খেলোয়ার ও ক্লাব সংশ্লিষ্টরা প্রবেশ করতে পারেন না। গত চার বছর থেকেই এমনটি হচ্ছে। শুরুর দিকে ক্লাবগুলোর কাছেও কেউ আসতো না। পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলে ক্লাবের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা দৌড়ঝাপ শুরু করেন। তারা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন থেকে শুরু করে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছেও গিয়েছেন। কিন্তু কোনো কাজের কাজ হয়নি। তিনি তাদের আশ্বাস দিলেও ওই আশ্বাসের বাণীও এখন নিরবে নিভৃতে কাঁদছে।
ক্লাবগুলোতে এখন খেলাধুলা চালানোর মতো পরিবেশ নেই। সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে। চুরি হয়েছে সকল মালামাল। ফলে ক্লাবগুলোকে এখন সাহসাই খোলা হচ্ছে না। তবে ক্লাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দাবি, দ্রুত ক্লাবগুলো খুলে দেওয়া হোক। ব্যক্তির দোষে ক্লাব কেন শাস্তি পাবে?
ক্লাবগুলো খোলার জন্য কোনো চেষ্টা করা হচ্ছে কিনা, এ নিয়ে বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে তারা দৌড়-ঝাপ করে এখন ক্লান্ত প্রায়। এ কারণে আশাও ছেড়ে দিয়েছেন। এখন পুরোটাই প্রধানমন্ত্রীর হাতে নির্ভর করছে বলে মনে করছেন তারা।
সাবেক খেলোয়াড়রা মনে করেন, ক্লাবগুলোকে খুলে না দেওয়া হলে রাজধানীর উঠতি যুবকদের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। ভাটা পড়তেই থাকবে ক্লাবপাড়ায়। দেশের ক্রীড়াঙ্গণে এই ক্লাবপাড়া থেকে নেতৃত্ব দেওয়া ও খেলার মতো খেলোয়াড়ও তৈরি হবে না। তাই তারা দ্রুত ক্লাবগুলো খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারকে।
জানা গেছে, চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) কাছে আবেদন করা হয়েছে ক্লাবগুলো খুলে দেওয়ার জন্য। তাদের পক্ষ থেকে এমন অনুরোধ পাওয়ার পর বাফুকে মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানিয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় এখনও সাড়া দেয়নি।
ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের একজন জানান, তারা তাদের ক্লাবটিসহ অন্য ক্লাবগুলো খোলার জন্য ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিলেন। তখন তিনি বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানাবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু সেই পানি আর বেশি দুর গড়ায়নি। গত চার বছরেও ক্লাবগুলো খুলে দেওয়ার ব্যাপারে কোনো ধরনের উদ্যোগ নেয়নি ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও ক্রীড়া পরিষদ এমনকি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)।
ওয়ান্ডারার্স ক্লাব-এর সাবেক ট্রেজারার কবিরুল হাসান বলেন, ক্লাবগুলো দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ অবস্থায় আছে। হয়ত ব্যক্তি অপরাধ করেছে, কিন্তু ক্লাব তো অপরাধ করেনি। এগুলো খুলে দেওয়া হোক।
তিনি জানান, ক্লাবগুলো খোলার জন্য বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বিভিন্ন জায়গায় দৌড়-ঝাপ শুরু করেছেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা কোনো ইতিবাচক সংকেত পাননি।
ইয়ংম্যানস ক্লাবের সাবেক গভর্নি়ং বডির সদস্য সাব্বির আহমেদ বলেন, আমরাও চাই ক্লাবগুলো খুলে দেওয়া হোক। এগুলো বন্ধ থাকার ফলে খেলোয়ারা ভালোভাবে প্র্যাকটিস করতে পারছে না। ক্লাবের ভেতরে কোনো কর্মকাণ্ড চালানো যাচ্ছে না। প্রতিমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি জানানো হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো সাড়া মেলেনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সিআইডির কর্মকর্তা বলেন, আমরা মামলার পর মালামাল জব্দ দেখিয়েছি। মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই ক্লাবগুলো আর খুলছে না। তবে কবে মামলাগুলো শেষ হবে, তাও তিনি জানেন না। এই সময় ১০ অথবা ১৫ বছরও লাগতে পারে।
ওয়ান্ডারার্স-এর একজন সাবেক খেলোয়ার বলেন, আমরাই ক্লাবগুলোকে নষ্ট করলাম। দারুন পরিবেশ ও ঐতিহ্য ছিলো। কিন্তু সেটিতে ক্যাসিনো চালিয়ে হাতে ধরে ক্লাবগুলোকে বন্ধ করে দিলাম। এখন আইনী জটিলতায় ক্লাবগুলো খোলাও কঠিন। ক্লাবের সংশ্লিষ্টরা গত কয়েক বছর ধরেই দৌড়াচ্ছেন। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। মনে হচ্ছে না যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়া এই ক্লাবগুলো খোলা সম্ভব হবে।
কয়েকটি ক্লাবে নতুন করে কমিটি করে ক্লাবের বাহিরে তারা বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজনও করেন। কিন্তু তাতেও তারা কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। ক্লাব বন্ধ থাকায় অধিকাংশ মানুষ মনে করেন যে ক্লাবগুলোর কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে। ফলে খেলোয়ারও তৈরি হচ্ছে না।
এ বিষয়ে ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের এডিসি এনামুল হক মিঠু ঢাকা মেইলকে বলেন, কেউ যোগাযোগ করেনি। আরামবাগ ক্লাব থেকে ওরা যোগাযোগ করেছিল। তখন আমরা তাদের বলেছি, এটা তো আমাদের বিষয় নয়। আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া এগুলো খোলার কোনো সুযোগই নাই। যেহুতু বন্ধ হয়েছে একটা লিগ্যাল ওয়েতে। মামলা চলমান আছে, জিডির ভিত্তিতে। এগুলো আদালতের অনুমতি ছাড়া খোলার সুযোগ নেই।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত