
দৈনিক জন্মভূমি
বিএনপি সরকারের নির্দেশনায় রক্তাক্ত জনপদ খুলনায় সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত হয়েছে। প্রকাশ্যে একের পর এক খুন রোধে এবং আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও জন দুর্ভোগ লাঘবে এ ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে পুলিশ গতানুগতিক তালিকার বাইরে আপডেট তালিকার জন্য মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নানা তথ্য উপাত্ত নিয়ে এ কার্যক্রমে গতি এনেছে। ফলে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজরা নড়েচড়ে বসেছে।
সূত্রমতে, দেশজুড়ে চাঁদাবাজদের একটি নিরপেক্ষ তালিকা তৈরির অংশ হিসেবে খুলনা জেলায় শীর্ষ চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরি করেছে র্যাব-৬। এ তালিকায় প্রাথমিকভাবে স্থান পেয়েছে শীর্ষ ১৫ চাঁদাবাজ এবং অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীসহ মোট ৩৩জন। র্যাব সূত্র জানিয়েছে, শিগগিরই এই চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু হবে। এ জন্য গোয়েন্দা নজরদারিও শুরু হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ পেলেই শুরু হবে অভিযান। এর আগে নগরে সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেলে পুলিশও তালিকা করে। তবে তা নিয়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফলে তালিকা হলেও সন্ত্রাসীরা গ্রেপ্তার হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে সাধারণ মানুষের।
এই পরিস্থিতিতে গত মার্চে খুলনা নগরের আট থানায় শীর্ষ ২৮ জন চাঁদাবাজ, ৪৭ সন্ত্রাসী ও ৪০১ মাদক কারবারিসহ মোট ৪৭২ জন অপরাধীর তালিকা তৈরি করে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ। তালিকায় রাজনৈতিক সংগঠন ছাড়াও সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের মধ্যে খুলনার শীর্ষ আটটি সন্ত্রাসী সংগঠনের নাম তালিকার ওপরের দিকে রয়েছে। সূত্র জানায়, কয়েকটি ক্যাটাগরিতে এ তালিকা করা হয়েছে। রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংবাদিক, শীর্ষ সন্ত্রাসী সংগঠন, অস্ত্রবাজ, মাদক বিক্রেতা ও সোনা চোরাচালানকারীরা এ তালিকায় রয়েছে।
এদিকে, নতুন সরকার গঠনের পরেও থেমে নেই রক্তাক্ত জনপদ বলে খ্যাত খুলনায় হত্যাযজ্ঞ। র্যাব পুলিশ নতুন উদ্যামে অভিযান চালালেও গান ফায়ার থামছে না। হচ্ছে না অস্ত্র উদ্ধার। আটক হচ্ছে না তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। বরং টপ কিলার বাহিনীগুলো এখন মরিয়া রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে। মাদক বেচাকেনা আধিপত্য বিস্তার চাঁদাবাজি এবং ঘাপটি মেরে থাকা আন্ডারওয়ার্ল্ডের সদস্যদের নতুন করে উত্থানের কারণে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটে চলেছে খুলনাঞ্চলে।
খুলনা অঞ্চল দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অন্তত সাতটি সন্ত্রাসী গ্রুপ। ফলে প্রায় দিনই অপরাধমূলক ঘটনা ঘটছে। খুনও হচ্ছে। নির্বাচনের আগে থেকে এসব শীর্ষ সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথবাহিনীর অভিযান শুরু হয়েছিল। কিন্তু বেশিরভাগ সন্ত্রাসী-অস্ত্রধারী, অপরাধী, চরমপন্থী ও দস্যু গ্রেপ্তার হয়নি। তাদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
গত দেড় বছরে খুলনা নগরীতে একাধিক সন্ত্রাসী সংগঠনের উত্থান, মাদক কারবার নিয়ে দ্বন্দ্ব, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিনিয়ত খুনাখুনি হচ্ছে। এ সময়ে ৬০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় সন্ত্রাসীরা অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে, এমন দাবি সাধারণ মানুষের।
এদিকে খুলনার প্রতিটি বস্তিতে একাধিক অস্ত্রধারীর অবাধ বিচরণ থাকায় প্রশাসন উদ্বিগ্ন। পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিটের তথ্যমতে, মহানগরীর অর্ধশতাধিক বস্তিতে সুড়ঙ্গ করে প্রশিক্ষিত স্কোয়াড রয়েছে। এ ছাড়া এসব বস্তিতে গড়ে চারজন করে নারী মাদক বিক্রেতা রয়েছে। যারা খুবই ভয়ানক।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, খুলনাঞ্চল মূলত চরমপন্থীদের এক সময়কার শক্ত ঘাটি। র্যাব পুলিশের অভিযানে এ ঘাটি তছনছ করা হয়। কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। আরও উদ্ধার হলে ভাল হতো। আমি যোগদানের পরে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারে ডিবিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, মোংলা, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা এলাকায় বনদস্যুদের দাপট আছে। এ সকল বনদস্যুদের সাথে চরমপন্থীদের এবং কিলারদের মিউচ্যুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং রয়েছে। যে কারণে এখনও তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। জেলার গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। গত ১৫ দিনে জেলার আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
একটি সূত্র জানায়, মহানগরীতে কিশোর গ্যাং নিয়ে গড়ে ওঠে রোহান ও পলাশ গ্রুপ। পরবর্তীতে এটি ভেঙে তিনটি বাহিনী পলাশ, ছালেন্দ বাবু এবং নূর আজিম হয়। দৌলতপুরের শীর্ষ চরমপন্থী হুমায়ুন কবির হুমা, আরমান শেখ ও নাসিমুল গনি গথির আলাদা বাহিনী আছে। নাসিমুল গনি শীর্ষ সন্ত্রাসী টাইগার খোকন হত্যা মামলার দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি। সে জেলে থাকায় এই বাহিনী কিছুটা নিষ্ক্রিয় ছিল। গত বছরের ২৬ নভেম্বর উচ্চ আদালত থেকে জামিন পায় নাসিমুল গনি এবং অপর বাহিনী প্রধান আরমান শেখ। এরপর তারা খুলনার কারাগার থেকে মুক্তি পায়। ফলে খুলনায় এখন সাতটি সন্ত্রাসী বাহিনী সক্রিয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত