
খুলনা, ১৮ মে ॥ প্রতিবছর কোরবানির ঈদ এলেই খুলনায় সড়কের ওপর বসে অস্থায়ী কাঁচা চামড়ার বাজার। মহানগরীর শেখপাড়া এলাকায় বেশি চামড়া কেনাবেচা হওয়ায় এলাকাটি একসময় ‘শেখপাড়া চামড়াপট্টি’ নামে পরিচিতি পায়। তবে দীর্ঘ ৬-৭ বছর ধরে খুলনায় কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ কিংবা কেনাবেচার জন্য কোনো স্থায়ী মার্কেট নেই। ফলে কোরবানির সময় বিপুল পরিমাণ পশুর চামড়া সংরক্ষণ, বিক্রি ও পরিবহনে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, স্থায়ী মার্কেট না থাকায় ঈদের সময় রাস্তায় বসেই চামড়া কেনাবেচা করতে হয়। এমনকি লবণ লাগিয়ে চামড়া সংরক্ষণও করতে হয় খোলা সড়কের ওপর। এতে একদিকে দুর্গন্ধ ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়, অন্যদিকে যানজট ও জনদুর্ভোগ বাড়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত সাত বছরেও খুলনায় চামড়া বেচাকেনার জন্য নতুন কোনো বাজার গড়ে ওঠেনি। সংরক্ষণের জায়গা না থাকায় প্রতিবছর কোরবানির ঈদে চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েন ব্যবসায়ীরা। এমনিতেই কয়েক বছর ধরে মন্দা যাচ্ছে চামড়ার ব্যবসা। দেনার দায়ে জর্জরিত হয়ে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। যারা এখনও টিকে আছেন, তারা স্থায়ী মার্কেট এবং ন্যায্যমূল্যে চামড়া বিক্রির ব্যবস্থা দাবি করছেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) কাছে বারবার পৃথক চামড়ার মার্কেট তৈরির দাবি জানানো হয়েছিল। তখন আধুনিক কসাইখানা নির্মাণের সঙ্গে চামড়ার জন্য আলাদা মার্কেট করার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে এবারও ঈদকে ঘিরে একই সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের।
এদিকে খুলনার চামড়া ব্যবসায়ীদের বিপুল পরিমাণ টাকা ঢাকার ট্যানারি মালিক ও আড়ৎদারদের কাছে বকেয়া রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিনেও সেই অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা নতুন করে চামড়া কিনতে শঙ্কায় রয়েছেন।
শেখপাড়া চামড়াপট্টির ব্যবসায়ী বাবর আলী বলেন, “আমরা প্রায় ৩৫ জন ব্যবসায়ী এখানে ১০টির মতো দোকানে ব্যবসা করতাম। কিন্তু বাড়িওয়ালারা চামড়ার দোকান রাখতে নারাজ থাকায় একে একে সব দোকান বন্ধ হয়ে যায়। ট্যানারিতে চামড়া দিয়েও টাকা না পাওয়ায় অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে।”
তিনি বলেন, “আমাদের একটি স্থায়ী মার্কেট দরকার। সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনাবেচার ব্যবস্থা হলে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ—দুই পক্ষই উপকৃত হবে।”
খুলনা কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কার্তিক ঘোষ বলেন, “সংরক্ষণের জায়গা না থাকায় ব্যবসায়ীরা চরম বিপাকে পড়ছেন। একসময় চামড়াপট্টির ঐতিহ্য ছিল, এখন তা হারিয়ে গেছে। আগে মহাজন ও মৌসুমি ফড়িয়ারা ব্যবসা করতেন, এখন হাতে গোনা কয়েকজন ব্যবসায়ী টিকে আছেন।”
তিনি আরও বলেন, “গত দুই বছর আমি নিজেও চামড়া কেনাবেচা করি না। জরুরি ভিত্তিতে ব্যবসায়ীদের জন্য একটি স্থায়ী মার্কেট প্রয়োজন।”
সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম ঢালী বলেন, “চামড়া ব্যবসা এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। একসময় কোরবানির মৌসুমে ৬০-৭০ হাজার চামড়া সংগ্রহ করতাম। তখন ৬০-৭০ জন ব্যবসায়ী ছিল। এখন হাতে গোনা কয়েকজন কোনো রকম ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছে। কেউ কেউ ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে।”
তিনি বলেন, “ব্যবসায়ীরা ধারদেনা করে চামড়া কেনে। কিন্তু ট্যানারিতে দেওয়ার পর কোটি কোটি টাকা বকেয়া পড়ে থাকে। ফলে ব্যবসায়ীরা পথে বসে গেছে। খুলনায় এখনো একটি আধুনিক কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ মার্কেট গড়ে ওঠেনি। এই শিল্প বাঁচাতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।”
তথ্যসূত্রে জানা যায়, গত বছর কোরবানী ঈদে খুলনা জেলায় মোট ২২ হাজার ৭৪২ পিস চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছিল।
এর আগে দেশের চামড়া শিল্প নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির। শনিবার (১৬ মে) সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে চামড়া শিল্প থেকে বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় সম্ভব। এটি দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত।”
জানতে চাইলে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, “ব্যবসায়ীরা চামড়ার মার্কেটের বিষয়ে জানালে সিটি করপোরেশন বিষয়টি বিবেচনায় নেবে। কোথায় করা যায় সেটিও আমরা ভেবে দেখবো।”
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত