
খুলনাজুড়ে অপরাধের ধরন পাল্টে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ঘটছে গোলাগুলি ও হতাহতের ঘটনা। নগরবাসীর মনে নেমে এসেছে গভীর আতঙ্ক। এই ক্রমবর্ধমান অপরাধের পেছনে নতুন এক উদ্বেগের তথ্য উঠে এসেছে—অপরাধীরা তাদের প্রতিটি মিশনে প্রধান বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে মোটরসাইকেল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুবিধা থাকায় সন্ত্রাসীদের মূল হাতিারে পরিণত হয়েছে এই দ্বিচক্রযান।
অপরাধের নেপথ্যে মোটরসাইকেল: সাম্প্রতিক চিত্র বিগত কয়েকদিনের অপরাধের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চলতি মাসের ২২ তারিখে বানিয়াখামারে প্রকাশ্যে গুলিতে একজন নিহত হন। একই দিন সন্ধ্যায় রূপসার লবণচরা এলাকায় মায়ের চোখের সামনে এক গৃহবধূকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এর রেশ কাটতে না কাটতেই ২৪ তারিখে তেরখাদায় ভ্যানে থাকা অবস্থায় এক যুবদল কর্মীকে গুলি করা হয়। ওইদিনই সন্ধ্যায় নগরীর টুটপাড়ায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হন এক মুদি দোকানদার। এমনকি ওই রাতেই একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভাঙচুর ও গুলির ঘটনা ঘটে।
সবশেষ ২৬ তারিখ দিবাগত রাত ১২টার পর বটিয়াঘাটা (বটিয়াঘাটা) উপজেলায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন এক ছাত্রদল কর্মী। আর ২৭ তারিখ সকালে নগরীর নিরালা মোড়ে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী এক সিগারেট কোম্পানির কর্মচারীকে গুলি করে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে চলতি বছরের প্রায় প্রতিটি সশস্ত্র হামলা ও গোলাগুলির ঘটনায় যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে মোটরসাইকেল ব্যবহৃত হয়েছে। খুলনার ভৌগোলিক অবস্থান ও বিভিন্ন এন্ট্রি-এক্সিট পয়েন্ট দিয়ে খুব সহজে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় অপরাধীরা এটিকে নিরাপদ বাহন হিসেবে বেছে নিচ্ছে।
অভাবের সুযোগ নিচ্ছে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু যাতায়াত নয়, অপরাধের সাথে জড়িয়ে আছে এক গভীর সামাজিক সংকট। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) ডিবির ডেপুটি কমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান জানান, অপরাধের প্রায় প্রতিটি কেসেই মোটরসাইকেলের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে।
তিনি বলেন, "আমরা বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছি, বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ নিম্নবিত্ত ও অভাবী পরিবারের তরুণদের দলে টানতে এবং নিজেদের দল ভারী করতে তাদের মোটরসাইকেল উপহার দিচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে এসব মোটরসাইকেলের মালিক ব্যক্তি পর্যায়ের এবং কাগজপত্রে ত্রুটি রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে চোরাই মোটরসাইকেলের ব্যবহারও পাওয়া যাচ্ছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মাদক বহনের কাজেও এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।"
তিনি আরও জানান, জামিনে মুক্তি পেয়ে অপরাধীদের পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে বড় একটি চ্যালেঞ্জ। এতে অনেক সময় পুলিশি কার্যক্রমের ওপরও প্রভাব পড়ে।
পুলিশের নড়েচড়ে বসা: আকস্মিক ব্লক রেইড ও বিশেষ অভিযান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) নড়েচড়ে বসেছে। আগের থেকে কোনো ধরনের পূর্বাভাস না দিয়ে নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে আকস্মিক ব্লক রেইড এবং বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে।
এ বিষয়ে খুলনা সদর থানার ওসি লোকমান হোসেন বলেন, "সন্দেহভাজন মোটরসাইকেল, ব্যক্তি ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে আমরা বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ করেই রেড দিচ্ছি। আমাদের সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করা হয়েছে। মোটরসাইকেল অত্যন্ত ছোট ও দ্রুতগতির বাহন হওয়ায় এবং খুলনায় অনেকগুলো এক্সিট পয়েন্ট থাকায় সন্ত্রাসীরা খুব সহজেই অপরাধ করে পালিয়ে যেত। তবে আমরা প্রতিটি ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা পরিচালনা করছি।"
পুলিশের এই বিশেষ অভিযান কেবল সাধারণ কাগজপত্র বা পরিচয়পত্র চেক করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সন্দেহভাজন চালক ও বাইকগুলোকে সরাসরি হেফাজতে নিয়ে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলেও জানান ডিবির ডিসি।
এসআরবি-৬ এর সূত্রে জানা যায়, এই মাসে ২০ তারিখের আগে সংঘটিত সকল অপরাধের ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে কার্যকর ভূমিকা রাখছে তারা। তবে ২০ তারিখ থেকে ২৬ তারিখ পর্যন্ত সংগঠিত সকল ঘটনা তারা পর্যবেক্ষণ করেছে এবং অনুসন্ধান করছে। পাশাপাশি দ্রুতই তারা অ্যাকশনে যাবে জড়িত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত