
বিভাগীয় শহর খুলনাতে এখন নগর পরিবন বলতে শুধু অটোরিক্সা ও সিএনজি নাগরিক সেবা দিয়ে আসছে। বহুদিন ধরে বন্ধ থাকা লোকাল বাস গত বছর চালুর কথা হলেও কোন এক অজ্ঞাত কারণে তা আর হয় নাই।
স্বাধীনতার পর ৬০ টি বাস নিয়ে নগর পরিবহনের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয় যাকে খুলনার লোকজন ‘টাউন সার্ভিস’ নামে চিনতো। যা নগরবাসিকে স্বল্পমূলে গণপরিবহন সুবিধা প্রদান করে। ৮০-৯০ এর দশকে এই নগর পরিবহণ বাসের চাহিদা ছিল তুঙ্গে ও সমাদৃত। ২০১৭ সালের দিকে এসে নগর পরিবহনের ৫৫ টি বাস চলাচলের অযোগ্য হয়ে পরে। পরের বছরই বন্ধ হয়ে যায় সেবাটি। এই সময়ে যুক্ত হয়নি কোন নতুন বাসও। এতে ভোগান্তিতে পড়েন নগরীর মানুষ। পরবর্তীতে একাধিকবার টাউন সার্ভিস চালুর উদ্যোগে নেওয়া হলেও ২০২০ সাল থেকে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর নগর পরিবহণ চালুর দাবিতে খুলনায় দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম চলছিল। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষ ও শিক্ষার্থীরা বারবার এ সেবা ফের চালুর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ২০২২ সালে আন্দোলনের চাপে মালিক সমিতির পক্ষ থেকে কিছুদিনের জন্য টাউন সার্ভিস চালু হলেও ইজিবাইক, মাহিন্দ্রা ও সিএনজি অটোরিকশার প্রতিযোগিতা এবং যাত্রী সংকটের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তা বন্ধ হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, খুলনার ফুলতলা থেকে রূপসা পর্যন্ত টাউন সার্ভিস চালুর জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে খুলনার বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। এর প্রেক্ষিতে খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের সম্মেলন কক্ষে গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর অংশীজনদের নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিআরটিসির দুটি বাস বরাদ্দ এবং বরাদ্দকৃত দুটির রুট চূড়ান্ত করা হয়। তখন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায় নাগরিক সমাজ, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন সংগঠন।
সভায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, নাগরিক সমাজ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার ফিরোজ সরকার জানিয়েছিলেন, খুলনায় পুনরায় টাউন সার্ভিস শুরুর জন্য বিআরটিসি চেয়ারম্যানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিনি দুটি বাস দিতে সম্মত হয়েছছিলেন।
বর্তমানে শহরজুড়ে অটোরিক্সা ও মাহেন্দ্র চলাচল করায় বাস চলাচলের চাহিদা কিছুটা কমে এসেছে। অনেকের মতে বাস এক একটি স্টপেজে অনেক সময় ব্যয় করে যাত্রী তোলে ও অনেক ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনার জন্য যাত্রীরা বাসে চড়ার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলে, যা প্রভাব ফেলেছে ঐতিহাসিক এই গণপরিবহন পরিচালনায়। এর পাশাপাশি অনেকেই মনে করেন এই টাউন সার্ভিস বাস বন্ধের পেছনে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাত আছে।
শহরজুড়ে অটো চললেও চালকের অদক্ষতা ও ট্রাফিক নিয়ম নিয়ে অজ্ঞতার কারণে খুলনায় বেড়েছে যানজট ও বিভিন্ন ধরনের দূর্ঘটনা। অনেকেই মনে করে এ সকল সমস্যা নিরসনে বিকল্প পন্থা হতে পারে পুনরায় গণপরিবনে বাস যুক্ত করা।
নিরাপদ সড়ক চাই খুলনা মহানগরের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মুন্নার সাথে প্রতিবেদকের কথা হলে তিনি বলেন, গত বছরে বিভাগীয় কমিশনার যখন প্রশাসক ছিল খুলনা সিটি কর্পোরেশনের তখন উনি একটা উদ্যোগ নিয়েছিলেন কিন্তু পরে যেয়ে আর এই বিষয়টি নিয়ে কোনো প্রক্রিয়া হয়নি, এখন যিনি প্রশাসক আছে তিনি হয়তোবা বিষয়টি উদ্যোগ নিতে পারে বলে আমাদের ধারণা। তাকে আমরা বলে দেখতে পারি। সবচেয়ে বড় কথা এই যে বাস নামানোর কথা বলছি আমরা, তা যদি অব্যবস্থাপনা পূর্ণ থাকে তাহলে জনসাধারণ ব্যবহার করতে চাইবেনা । কয়েকদিন পরে যারা মালিক অথবা যারা সংশ্লিষ্ট তাদের তেলের টাকাও ওঠবে না। কেউ কোনো স্টেশনে দুই মিনিট গাড়ি দাঁড়াক, এই ব্যস্ত জীবনে কেউ চায় না। অথচ একটি পরিবহন চলতে কত খরচ, সেগুলো মাথায় নিয়েই নামানো যেতে পারে যেন সকলে ইতিবাচকভাবে নেয়।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মোঃ বাবুল হাওলাদার জানান, দেশের তৃতীয় বৃহত্তম বন্দর ও শিল্পনগরী খুলনা। সময়ের ব্যবধানে এখানকার নগরীর প্রশস্ততা বেড়েছে, এখানকার মানুষ বেড়েছে। কিন্তু যখন এটি পৌর শহর ছিল বা পৌরসভার অধীন ছিল, তখন আমরা জানি যে, ৫৫টি বাসের সর্বশেষ একটি নগর পরিবহনের বহর ছিল। কিন্তু সেই পরিবহনটি বন্ধ হয়ে গেলো। বন্ধ হয়ে থ্রি-হুইলার বিভিন্ন রকমের গাড়ি যার উপরে নির্ভরশীল হয়ে গেলো, এখানে বলতেই হচ্ছে যে একটি চক্র যারা বিভিন্নভাবে তদবির করে এই বাসগুলোকে বন্ধ করেছে।
খুলনা শহরে একটা নগর পরিবহন নাই, চার চাকার বা ছয় চাকার কোনো গাড়ি নাই। এইটা আসলে খুলনার বাইরের মানুষ শুনলে বিশ্বাসও করতে চাইবেন কিনা, আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে, কিন্তু এটাই বাস্তবতা। এখন যদি নগর পরিবহনের কাজ শুরু হয়, তাহলে আমার মনে হয় যে সেখানে বাসের সংখ্যা আরও বেশি বৃদ্ধি করা দরকার। হতে পারে সেইটা ছোট গাড়ি, কারণ অনেক রুটে আছে যে অনেক বড় গাড়ি, সেটা চালিয়ে বা খুব অল্প সময়ের মধ্যে সেই ব্যবসা সফল হবে না বা সেটা লোকসান হতে পারে। তো সেইটা বিবেচনায় নিয়ে আমার মনে হয় যে, নগর পরিবহনটা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে চালু করা দরকার। এটা আসলে সময়ের দাবি।
আমরা দেখেছি যে খুলনা বিভাগীয় কমিশনার এবং খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্বে ছিলেন ফিরোজ সরকার। তিনি দুটো গাড়ি দিয়ে বিআরটিসির এটা চালু করতে চেয়েছিলেন, সেটার আয়োজনও প্রায় সম্পন্ন হয়েছিল, তার বদলিজনিত কারণে এবং পরবর্তীতে আমরা দেখলাম যে কিছু ক্ষেত্রে বিরোধিতা, তো সবকিছু মিলিয়ে সেটা আর আসলে আলোর মুখ দেখেনি। তো অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে সেই যে উদ্যোগ এবং তার সাথে যারা এখন জনপ্রতিনিধি আছেন, এখন গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায়, এখানে যারা রয়েছেন সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বে, তারপর দুইটা আসন আমরা জানি এই যে মহানগরীর মধ্যে এবং এই দুইটা আসনের বাইরেও এখন শহর যে বিস্তৃতি হয়েছে, সেখানে আমরা যদি বলি যে ১ নম্বর আসন, ৫ নম্বর আসন, এই আসনগুলার যারা জনপ্রতিনিধি রয়েছেন, তাদের উচিত এই বিষয় নিয়ে কাজ করে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটা কার্যকর নগর পরিবহন চালু করা, এটি আসলে সময়ের দাবি।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত