
বাংলাদেশে নগরায়নের পথচলায় ঘরে বসে শখ পূরণের মাধ্যম হিসেবে শুরু হওয়া ছাদবাগান আজ রূপ নিয়েছে এক সবুজ বিপ্লবে। রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই চর্চা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। বিভাগীয় শহর খুলনায় এই জনপ্রিয়তা আজ তুঙ্গস্পর্শী। একসময়ে হাতে গোনা কয়েকটি বাসায় ছাদবাগান দেখা গেলেও ২০২৬ সালে এসে প্রায় প্রতিটি বাড়ি কিংবা আবাসিক ভবনে গড়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন ছাদবাগান। ছোট্ট ছাদের সবুজ এই পরিসরে পরিবারের সাথে বিকেল কাটানোর রীতিনীতি আজ খুলনার আধুনিক জীবনধারার অন্যতম অংশ।
বিগত বেশ কিছু বছরে খুলনায় ব্যাপকহারে বেড়েছে ছাদবাগান তৈরির হার। শুধু মনের খোরক মেটানোর জন্যই নয়, অনেকে ছাদবাগান থেকে ব্যবসায়িকভাবে হচ্ছেন লাভবানও। বারান্দা বা ছাদের ছোট্ট জায়গাতেই টমেটো, বেগুন, কাঁচামরিচ থেকে শুরু করে আম, ড্রাগন ফল কিংবা মাল্টার মতো পুষ্টিকর ফল সফলভাবে উৎপাদন করা হচ্ছে।
পরিবেশ রক্ষা এবং নিজের ও পরিবারের সুস্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে খুলনার তরুণ সমাজও এখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই সবুজ আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছে। ছাদবাগান পরিচর্যা আজ শুধু একটি একক শখ নয়, বরং এটি পরিণত হয়েছে এক সামাজিক আন্দোলনে—যা আগামী দিনে খুলনাকে আরও সবুজ, সুন্দর ও বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ডা. আমিরুল খসরুর ছাদ এখন এক জীবন্ত অরণ্য
খুলনার বিশিষ্ট ছাদবাগানি ডা. আমিরুল খসরুর (Amirul Khusru) ছাদ এখন হাজারও দুর্লভ গাছে ঘেরা এক জীবন্ত অরণ্য। ২০০০ সালে শখের বশে কোনো আধুনিক উপকরণ বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই বই পড়ে গাছ পরিচর্যা ও বনসাই করার কৌশল শিখেই এই সবুজযাত্রার শুরু করেছিলেন তিনি।
বর্তমানে খুলনার অন্যতম সেরা ও ব্যয়বহুল এই ছাদবাগানটিতে প্রায় ১১০০ থেকে ১২০০টি দুর্লভ গাছ রয়েছে, যার বেশিরভাগ জুড়েই রয়েছে বনসাই, ফল ও ফুল গাছ। বেগুনী কৃষ্ণচূড়া, উইপিং তেঁতুল, ব্লু বেল, রুবি লঙ্গন, এলাচ লেবুসহ বাংলাদেশের সচরাচর দেখা মেলে না এমন অনেক উদ্ভিদও রয়েছে তার সংগ্রহে। এছাড়া তার প্রায় দুই দশক পুরোনো বনসাইগুলো তিনি নিজেই তিলে তিলে তৈরি করেছেন। তার ছাদ বাগানের আনুমানিক ১ কোটি টাকার গাছ আছে যা সংগ্রহ করা হয়েছে প্রায় আড়াই যুগ ধরে, আর এর সবগুলোকেই তিনি নিজের হাতে বনসাই এর উপযোগী করেছেন তিন।



বাগানটির অন্যতম আকর্ষণ হলো এর কাস্টমাইজড ও নিজ হাতে তৈরি টবগুলো। মাটির পাত্র, সিরামিক ও কাঠের টুকরো দিয়ে নান্দনিক এসব টব তৈরির জন্য তার একটি নিজস্ব ছোট ওয়ার্কশপও রয়েছে, যেখানে প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয়। চারপাশের ছাদজুড়ে গড়ে ওঠা এই প্রাকৃতিক আবাসে এখন নিয়মিত চড়ুই ও পার্পেল সানবার্ডের মতো নানা পাখির কলকাকলিতে মুখরিত থাকে পুরো পরিবেশ।
ছাদবাগান করে মাসিক ইনকাম করছেন বিএল কলেজের সাদিয়া
নাজিরঘাট নিবাসি সাদিয়া তারান্নুম পেশায় একজন কলেজ ছাত্রী। ২০২২ সালে নিজের বোনের বাড়িতে অবস্থানকালে ছাদে গড়ে তোলেন একটি ক্যকটাস বাগান। এর পর যোগ করেন স্নেক নামের পাতাবাহারি। শুরুরে মূলত আনন্দের জন্য করলেও বর্তমানে তার ছাদবাগান বাণিজ্যিকভাবে সফল। প্রায় ১০০ এর অধিক ক্যাকটাস ও ২০০+ স্নেক প্লান্ট ভ্যারাইটি চারা করেন সাদিয়া ও তার নিজের ৩১০০০ হাজার মেম্বার সংবলিত ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় করেন সরবরাহ যার একএক্টির মূল্য ১০০০ থেকে শুরু করে ২০০০ পর্যন্ত সাইজভেদে।



তিনি যানান তিনি বিভিন্ন সময় গাছ কিনে ইউটিউবে দেখে এগুলো কলপ করেন ও পলিনেশন (pollination) করে একই গাছের আলাদা আলাদা প্রজাতি তৈরি করেন। বর্তমানে তার ছাদে ৫-৬ লাখ টাকার চারা আছে যা বিক্রির জন্য প্রস্তুত। মাসিক ইনকাম করেন ২০-২৫ হাজার টাকা। মুলত ভালোলাগা থেকেই আজ তার এই এগিয়ে যাওয়া। তার কাছ থেকে গাছ কিনে বিভিন্ন নার্সারি সেলও করে। এবং তার প্রতি ৬ মাসে খরচ হয় সর্বোচ্চ ৫০০০ টাকা রক্ষণাবেক্ষণে।
খুলনার ছাদ-বাগানিদের নিয়ে ‘সবুজে হাসি-সবুজে বাঁচি’
তানভীর আহমেদ সজল পেশায় একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থার সাথে যুক্ত। তার সাথে কথা হলে তিনি জনান, খুলনায় তার ইনডোর ও ট্রপিক্যাল গাছের বাগানটি সম্পূর্ণ শৌখিন এবং এক্সোটিক উদ্ভিদে সমৃদ্ধ। ২০১৯ সালে তিনি বর্জ্য পদার্থের বিনিময়ে মানুষের মাঝে গাছ বিতরণের মাধ্যমে একটি উদ্যোগের যাত্রা শুরু করেছিল, নাম দিয়েছিলেন ইজি ডোর, তবে পরে যেয়ে খুব বেশি সারা না পাওয়ায় তা নিয়ে এগোননি, বর্তমানে তিনি গাছ বেচাকেনা করেন তার বাগান থেকেই। বর্তমানে প্রায় ২০০টির বেশি প্রজাতির বিদেশি গাছের সংগ্রহ আছে তার। সিজনাল ভিত্তিক এই ব্যবসায় গাছ ছাড়াও সার, মাটি, টব এবং অন্যান্য গার্ডেনিং এক্সেসরিজ বিক্রি করা হয়, যার মাধ্যমে আনুষঙ্গিক সামগ্রীসহ বর্তমান মাসিক বিক্রি গড়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা এবং ভালো প্রফিট অর্জিত হয়। খুলনার ছাদবাগানপ্রেমীদের একত্রিত করতে এবং তথ্য আদান-প্রদান ও কমিউনিটি তৈরিতে ‘সবুজে হাসি সবুজে বাঁচি’ নামের সংগঠনটি কাজ করে যাচ্ছে যার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। ভবিষ্যতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে গাছের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা এবং প্রযুক্তির যুগে নতুন প্রজন্মকে প্রকৃতির কাছাকাছি আনা এই সংঠনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এছাড়া শহরের কমে যাওয়া মাটির জমির বিকল্প হিসেবে ছাদ ও ভবনের ওপর ভার্টিক্যাল গার্ডেনিং বা ছাদবাগানকে জনপ্রিয় করে পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ এবং খুলনা শহরকে আরও সবুজ ও বাসযোগ্য করে তোলার প্রত্যয়ে এই সবুজ আন্দোলন এগিয়ে চলেছে।
২০২৬ সালে খুলনার বৃক্ষমেলায় রেকর্ড পরিমান বিক্রি
খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠে মাসব্যাপী আয়োজিত বৃক্ষমেলা শেষ মুহূর্তে এসে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের ভিড়ে দারুণ জমে উঠেছে। সাধারণ দিনগুলোতে কিছুটা উপস্থিতি থাকলেও ছুটির দিনে স্টলগুলোতে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মেলা প্রাঙ্গণ জুড়ে দেশি-বিদেশী ফলজ, বনজ, ভেষজ ও ফুলের চারার বেচাকেনা চলছে পুরোদমে। মেলার সমাপনী সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ক্রেতাদের ভিড় ও আগ্রহ ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। পছন্দের চারা কিনতে স্টলে স্টলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ক্রেতারা, আর ব্যস্ত সময় পার করছেন বিক্রেতারাও। সবমিলিয়ে দর্শনার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ এখন মুখরিত। উৎসবমুখর এই মেলায় গত ২৭ দিনে ৬৪ হাজার ৫৪৬টি চারা বিক্রি হয়েছে, যার মোট বাজারমূল্য রেকর্ড ৯২ লাখ ৫৬ হাজার ৫০ টাকা যা আগের অন্যান্য বছরগুলা থেকে অনেকগুন বেশি। আশা করা যাচ্ছে আর বাকি ২-৩ দিনে তা কোটিতে রুপ নেবে।



ডালিয়া নার্সারির কর্ণধার ও খুলনা নার্সারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু মাসুদ জানান, বর্তমানে খুলনায় বনসাই এর চাহিদা অনেক যা বৃক্ষমেলায়ও প্রতীয়মান। খুলনায় ছাদ বাগানীদের সংখ্যা পরিসংখ্যান না থাকলেও তা আগের যে কোন সময়ের থেকে অনেক বেশি এর ভবিষ্যত দারুণ সম্ভাবনাময়
খুলনা বিভাগীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন এবং খুলনা সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ। গত ১১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এ মেলা ১১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত