
পাকিস্তানি হানাদারদের নৃশংসতা ও অত্যাচারের মুখে প্রাণের ভয়ে খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, রামপাল, মোরেলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মোংলা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, চালনার লাখ লাখ হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ বিপুল সংখ্যক মানুষের উদ্দেশ্য তখন খুলনার ডুমুরিয়া হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে পৌঁছানো। উদ্দেশ্য একটাই ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়া। ভারতীয় সীমান্তে পাড়ি জমাতে হলে ডুমুরিয়া পর্যন্ত ভদ্রা নদী দিয়ে নৌকায় আসা ছিলো অপেক্ষাকৃত অনেকটাই সহজ। কারণ এরপর সাতক্ষীরা হয়ে ভারতীয় সীমান্ত। কারণ এদিকে নদীপথে যাতায়াতের সুবিধা, অনেকটা নিরুত্তাপ। এখানে হানাদার বাহিনীর আনাগোনা নেই বললেই চলে। আটলিয়া ইউনিয়নের চুকনগরের চারপাশ তখন নিচু এলাকা। কেবল চুকনগর বাজারটা তখন খানিকটা উঁচু। চুকনগরে প্রবাহমান ভদ্রা নদী। ২০ মে, ১৯৭১ যে নদী হয়েছিল রক্ত গঙ্গা।
এপ্রিল ও মে মাসে দক্ষিণাঞ্চল হিন্দুদের উপর পাকিস্তানি হানাদারদের নির্যাতন ও গণহত্যা চরম পর্যায়ে পৌঁছালো। হিন্দু নরনারীদের বসবাস তখন যেন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে। দক্ষিণাঞ্চলের নানা প্রান্ত থেকে আসা শরণার্থী হয়ে পাড়ি জমানো মানুষের ঢল তখন চুকনগর হয়ে সীমান্ত মুখী। চুকনগর বাজার তাই বেশ পরিচিত। তিন দিক থেকে নদী ঘেরা চুকনগর বাজার। ভদ্রা নদী দিয়ে নৌকা করে আসা মানুষের একমাত্র বিশ্রামস্থল এই বাজার। কারণ এরপর একটানা বিরামহীনভাবে চলে সীমান্তের দিকে। চুকনগর বাজারে এলে মানুষ নৌকা থেকে নেমে রান্নাবান্না করে, শেষ সদাইটুকু করে নেয়, কেউবা জিরিয়ে নেয়। অতঃপর সীমান্তের দিকে যাত্রা। মে মাসের আগ পর্যন্ত ভারতে আশ্রয় প্রত্যাশী শরণার্থীদের ভিড় অবশ্য কম ছিল। এদিকে এই পথের সুবিধার কথা ভেবে ধীরে ধীরে ভিড় বাড়তে লাগলো। কিন্তু ১৮ এবং ১৯ মে যেন জনস্রোতের সব সীমা ছাড়িয়ে গেল। হাজারে হাজারে মানুষ আসছে, চুকনগরের আশপাশে তখন মানুষের স্রোতে যেন মেলার মতো। মানুষ আসছে, খানিক বিশ্রাম নিয়ে কিংবা রাত কাটিয়ে চলে যাচ্ছে সীমান্তের দিকে। পাকিস্তানি হানাদারদের এখানে চিহ্ন মাত্রও নেই। ওরা তখন জানে না এখানে এতো মানুষের ঢল নেমেছে।
তখন আটলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন গোলাম হোসেন। শান্তি বাহিনীর সদস্য চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন ও ভদ্রা নদীর খেয়া ঘাটের ইজারাদার শামসুদ্দিন খাঁ নামের এক বিহারী ১৯ মে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাতক্ষীরা ক্যাম্পে যোগাযোগ করে বললেন, চুকনগর বাজারের বর্তমান অবস্থার কথা। হিন্দুদের ঢল নেমেছে চুকনগরে। পাকিস্তানি ক্যাম্পে যোগাযোগ করার পরে হানাদারেরা খবর পেয়ে একটি ট্রাক ও একটি জিপে করে সেনা পাঠায়। এর আগে ১৯ মে অর্ধ লক্ষের বেশি মানুষ চুকনগরের পাতখোলা বিল, চুকনগরের কাঁচাবাজার, মাছবাজার, কাপুড়িয়া পট্টি, গরুহাটা, বাজারের কালী মন্দির, বটতলাসহ বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেয়। তখনো মানুষ কেবলই আসছিল নানা প্রান্ত থেকে। উদ্দেশ্য এখানে রাত কাটিয়ে পরদিন সকালেই সীমান্তের উদ্দেশ্যে যাত্রা। এ সময় মানুষের ভিড়ে চারদিক গমগম করছিল। কেউ রান্না করছে, কেউ সওদাপাতি কিনছে, কেউ সঙ্গে আনা পলিথিনের আস্তরণ দিয়ে তাঁবু বানিয়ে নিচে অবস্থান নিয়েছেন। কেউ আশংকায় রাত্রি কাটিয়েছেন নির্ঘুম চোখে, কারণ একটা চাপা আতঙ্ক কাজ করছিল অনেকের মধ্যে।
২০ মে ১৯৭১, আজকের মতো সেদিনের দিনটিও ছিল বৃহস্পতিবার। আগের সারা রাত হাজার হাজার মানুষ পায়ে হেঁটে, নৌকায়, গরুর গাড়ি করে এসেছে চুকনগরে। উদ্দেশ্য সকালের আলো ফুটলেই রওনা দেয়া। ভোর হতেই চারপাশ জেগে উঠলো। মানুষের গ্রোত তখন সীমান্তের পানে। পায়ে হেঁটে সীমান্তের দিকে যাচ্ছে মানুষ, কেউ মালপত্র গোছাচ্ছে, কেউ রান্না চাপিয়েছে। কারো রান্না হয়ে গেছে, অনেকে রওনা দিয়ে দিয়েছে সীমান্তের উদ্দেশ্যে, অনেকে মাত্র খেতে বসেছে কেবল।
বেলা তখন সাড়ে ১১টা বাজে। ঠিক এমন সময়েই সাতক্ষীরা থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ১টি ট্রাক ও ১টি জিপ চুকনগর-সাতক্ষীরা সড়ক ধরে মালতিয়া মোড়ের ঝাউতলায় এসে থামে। এ সময় রাস্তার পাশে পাট খেতে কাজ করছিলেন মালতিয়া গ্রামের চিকন আলী মোড়ল নামে একজন। তিনি গাড়ির শব্দে উঠে দাঁড়ালে পাকিস্তানি হানাদারেরা তাকে দেখে গুলি করতে গেলে তিনি হাতের কাস্তে ছুঁড়ে মারেন হানাদারদের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশফায়ার। এরপর একই গ্রামের সুরেন্দ্রনাথ কুন্ডুকেও গুলি করে মারা হয়।
এরপর পাতখোলা বাজারে ঢুকে গণহারে নিরীহ মানুষদের লাইনে দাঁড়িয়ে গণহত্যা শুরু করে হানাদারেরা। পাকিস্তানি হানাদারেরা ভাগ হয়ে এক দল পাতখোলা বিল থেকে চাঁদনী, ফুটবল মাঠ, চুকনগর স্কুল, মালতিয়া, রায়পাড়া, দাসপাড়া, তাঁতিপাড়া, ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদীর পাড়ে জমা হওয়া মানুষের উপর গুলি চালাতে শুরু করে। চুকনগরের আকাশ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে অস্ফুট আর্তনাদ, মৃত্যু যন্ত্রণা। প্রাণ বাঁচাতে মানুষের আপ্রাণ চেষ্টা হওয়া সত্তে¡ও হালকা মেশিনগানের অবিরাম গুলিতে ধ্বংসলীলা নেমে এসেছিলো এই জনপদের বুকে। ভদ্রা নদীর জল সেদিন লাল টকটকে রক্তে ভেসে গিয়েছিল। কোথাও লাশের কারণে নদী পথ আটকে গেছে। সেদিন যারা সাঁতরে নদীর ওপাড়ে পৌঁছাতে পেরেছিল, তারাই বাঁচতে পেরেছিল।
সকাল সাড়ে ১১টায় শুরু হওয়া পাকিস্তানি হানাদারদের এই গণহত্যা গুলি ফুরিয়ে আসার কারণে থামলো দুপুর তিন টায়। চার মাইল ব্যাপী চলা এই নিষ্ঠুর গণহত্যায় শহীদদের প্রকৃত সংখ্যা আজও পাওয়া যায়নি। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে এই গণহত্যায় শহীদ হয়েছেন প্রায় ১২ হাজারের মতো নিরীহ মুক্তিকামী মানুষ।
এই গণহত্যায় প্রকৃত সংখ্যা না পাওয়ার কারণ নদীর পানিতে প্রথমে অজগ্র লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল। অন্যদিকে আঞ্চলিকভাবেও উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি কারণ গণহত্যায় শহীদ বেশির ভাগ মানুষ ছিলেন চুকনগর কিংবা ডুমুরিয়া ও খুলনার বাইরের অঞ্চলের। বিশেষ করে বাগেরহাট বরিশাল, ফরিদপুর, রামপাল, মোরেলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলা, দাকোপসহ নানা জায়গা থেকে যারা এসেছেন তাদের স্বজনদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। কারণ স্বজন পরিজনেরা ভেবেছিলো তারা হয়তো নিরাপদে ভারতে পৌঁছে গেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পর আর ফিরে আসেননি।
চুকনগর গণহত্যায় অজগ্র শিশু হারিয়েছিল তাদের বাবা মা কে। অনেক নবজাতককে চুকনগরসহ আশপাশে বহু গ্রামের মানুষ লালন পালন করেছিলেন। এর মধ্যে এমনই এক শিশু ‘সুন্দরী’।
এই গণহত্যার পরদিন তথা ২১ মে সকালে বর্তমান চুকনগর কলেজের সামনে পাতখোলা বিলে বাবা চিকন আলী মোড়লের লাশ খুঁজতে গিয়েছিলেন এরশাদ আলী মোড়ল। এ সময় লাশের স্তূপের মধ্যে মৃত মায়ের স্তন থেকে দুধপানরত ৬ মাস বয়সী এক শিশুকন্যাকে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে শিশুটিকে বাড়ি নিয়ে যান তিনি। তিনি নাম রেখেছিলেন সুন্দরী। এদিকে সুন্দরীর মায়ের কপালে সিঁদুর ও হাতের শাঁখা দেখেছিলেন এরশাদ আলী মোড়ল। তাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী হিসেবে এক হিন্দু পরিবারেই বড় করিয়েছেন তিনি।
এক সাক্ষাৎকারে সুন্দরী বলেন ‘চুকনগর বধ্যভূমিতে গেলে আজও বুকটা হাহাকার করে ওঠে। খুঁজে ফিরি মা-বাবাকে। কিন্তু আমি তো জানি না আমার পৈত্রিক বাড়ি কোথায়। শুধু জানি, বাঁচার আশায় আমার পরিবার এখানে এসেছিলো।’ মুক্তিযুদ্ধের ২০ মে আজকের দিন সংগঠিত হয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ গণহত্যা চুকনগর গণহত্যা। চুকনগর গণহত্যা দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি শহীদদের।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত