বর্ষা আসতে না আসতেই এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বাড়ছে। প্রতিদিনই শত শত রোগী জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। বর্ষার আগেই প্রকোপ বেড়ে চলায় এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
শনিবার (১৭ জুন) স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ৪৭৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা চলতি বছরে সর্বোচ্চ। নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ৪০২ জনই রাজধানীর বাসিন্দা। এই সময়ে নতুন করে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর এক দিনে এটাও সর্বোচ্চ মৃত্যু।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, বর্তমানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে সর্বমোট এক হাজার ১৩৮ জন ভর্তি আছেন। তাদের মধ্যে ঢাকার ৫৩টি ডেঙ্গু ডেডিকেটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৯১১ জন। এছাড়া ঢাকার বাইরে ২২৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন।
প্রখ্যাত চিকিৎসক অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, এবার ডেঙ্গুর ধরন পরিবর্তন হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তির এক-দুই দিনের মধ্যে অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তাই জ্বরের সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে এসে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম দিন (১ জানুয়ারি) থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট চার হাজার ৬০৩ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন তিন হাজার ৪৩২ জন। চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৩৩ জন।
এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি কেন?
সাধারণত জুন মাসের পর ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিলেও এ বছর মে মাস থেকেই এই রোগের প্রকোপ বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় মে মাসেই চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ডেঙ্গুর এই আগাম প্রকোপের কারণ জানাতে গিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, ‘আগের বছর ডেঙ্গুর সিজনটা দেরিতে শুরু হয়েছিল। গত বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চসংখ্যক ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। এই ধারাটা নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি পর্যন্ত চলে এসেছে। বর্তমান সময়ে এসে সারা বছরই ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। এর নেপথ্য কারণ হিসেবে যা দেখেছি সেটি হলো রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় নগরায়নের বেশ কিছু পরিবর্তন হয়েছে।’
DD1
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বাংলাদেশে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত একদমই বৃষ্টিপাত থাকে না। আমরা বার বার বলে এসেছি যে, বৃষ্টির সঙ্গে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার একটি সম্পর্ক থাকলেও এখন আর সেটি নেই। ডেঙ্গু এখন আর মৌসম বুঝে হবে না, এটি সারা বছরই বাংলাদেশে থাকবে। বহুতল ভবনগুলোতে পার্কিং স্পেস তৈরি করা হয়েছে। পার্কিংয়ের এই জায়গাতে গাড়ি ধোয়া-মোছা করা হয়। সেখানে যে পানি জমে তাতে আমরা এডিস মশার লার্ভা পাই।
ডেঙ্গু হওয়ার তিন থেকে সাত দিন এর তীব্র লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক কমে যাওয়া, তীব্র পেট ব্যথা, ক্রমাগত বমি করা, বমির সঙ্গে রক্ত যাওয়া, ঘন ঘন শ্বাস নেওয়া এবং শরীরে অবসাদ বোধ করা ও অস্থিরতা বোধ করা।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এবার বৃষ্টির ধরনটাই একটু আলাদা। গত মে মাসের শেষ দিকে সারাদেশেই, বিশেষ করে ঢাকা শহরে বেশ বৃষ্টিপাত হয়ে গেছে। এরপর প্রায় ১০ দিনে আর বৃষ্টি হয়নি। এই সময়ের মধ্যে ডেঙ্গুর ডিম থেকে লার্ভা হয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক মশা হওয়ার জন্য যথেষ্ট। এ ছাড়া ঢাকা শহরে বৃষ্টি ছাড়াও প্রচুর নির্মাণ কাজ হচ্ছে। নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে একনাগাড়ে অনেক দিন পানি আটকে থাকে। সেখানে এডিস মশা প্রতিনিয়তই ডিম ছেড়ে বংশ বৃদ্ধি করতে পারছে। মূলত নির্মাণাধীন ভবন থেকে মশার বংশ অবাধে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে এবার ঢাকা শহরে ডেঙ্গু বৃদ্ধি পেয়েছে পুরো মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ১১ সুপারিশ
প্রখ্যাত চিকিৎসক অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, এবার ডেঙ্গুর ধরন পরিবর্তন হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তির এক-দুই দিনের মধ্যে অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তাই জ্বরের সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে এসে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
সতর্ক হওয়ার তাগিদ
ডেঙ্গুর প্রকোপ যে এবার বেশি হতে পারে সে ব্যাপারে গত ২৯ জুন সতর্ক করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। সেদিন তিনি সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ গত বছরের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি।
গত ১০ জুন স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম জানান, চলতি বছর এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের প্রায় প্রত্যেকে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে ভুগছিলেন এবং শক সিনড্রোমে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
নিজেদের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে স্বাস্থ্যের ডিজি সেদিন বলেন, সারাদেশে রোগী সংখ্যা কম থাকলেও আমরা সারাদেশের সকল হাসপাতাল প্রস্তুত রেখেছি। এ বিষয়ে সকলকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সংশোধিত গাইডলাইন প্রত্যেক হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়েছে। হাসপাতালগুলোর চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসক, ওষুধসহ সবকিছু সরবরাহ করা হচ্ছে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতর ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থেকে পরিবেশ পরিচ্ছন্নতার ওপর নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। সেই সঙ্গে এডিস মশাবাহিত রোগটির প্রকোপ মোকাবেলায় স্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয়ের প্রতিও নজর দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
DD22
সম্প্রতি এক তথ্যবিবরণীতে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি হওয়ার পাশাপাশি দুটি লক্ষণ দেখা দিলে ডেঙ্গু সন্দেহে নিকটস্থ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। লক্ষণ দুটি হলো- তীব্র মাথা ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরের পেশি ও জয়েন্টসমূহে ব্যথা এবং বারবার বমি করার প্রবণতা।
প্রতিবছর বর্ষাকালে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। ২০১৯ সালে দেশব্যাপী ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন। ওই সময়ে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রায় ৩০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
তীব্র ডেঙ্গুর লক্ষণ সম্পর্কে জানিয়ে তথ্যবিবরণী বলা হয়েছে, ডেঙ্গু হওয়ার তিন থেকে সাত দিন এর তীব্র লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক কমে যাওয়া, তীব্র পেট ব্যথা, ক্রমাগত বমি করা, বমির সঙ্গে রক্ত যাওয়া, ঘন ঘন শ্বাস নেওয়া এবং শরীরে অবসাদ বোধ করা ও অস্থিরতা বোধ করা।
তথ্যবিবরণীতে মশার প্রজনন রোধে কয়েকটি কাজ করার পরামর্শও দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এগুলো হলো- ঘর ও আশেপাশে যেকোনো পাত্রে বা জায়গায় জমে থাকা পানি তিনদিন পরপর ফেলে দিলে এডিস মশার লার্ভা মরে যাবে, ব্যবহৃত পাত্রের গায়ে লেগে থাকা মশার ডিম অপসারণে পাত্রটি ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করতে হবে এবং ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের ড্রাম, মাটির পাত্র, বালতি, টিনের কৌটা, ডাবের খোসা বা নারিকেলের মালা, কন্টেইনার, মটকা, ব্যাটারি সেল ইত্যাদিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে বিধায় এগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু হচ্ছে শক সিনড্রোমে: স্বাস্থ্য ডিজি
এছাড়াও পানি যাতে না জমে সেজন্য অব্যবহৃত পানির পাত্র ধ্বংস করতে হবে অথবা উল্টে রাখতে হবে, দিনে অথবা রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে এবং ডেঙ্গু হলে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দ্রুত যোগাযোগ করার পরামর্শও দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
প্রতিবছর বর্ষাকালে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। ২০১৯ সালে দেশব্যাপী ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন। ওই সময়ে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রায় ৩০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২০ সালে করোনা মহামারিকালে ডেঙ্গুর সংক্রমণ তেমন একটা দেখা না গেলেও ২০২১ সালে সারাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। ওই বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া ২০২২ সালে ডেঙ্গু নিয়ে মোট ৬২ হাজার ৩৮২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এর মধ্যে গত বছর মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে ২৮১ জন মারা গেছেন।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত