
খুলনা (১২ মার্চ
শিশু ও যুব ফোরামের সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন, নিরাপদ খাদ্য, সাইবার বুলিং, ড্রাগ এডিকশনসহ নানা বিষয় নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির প্রত্যায় ব্যক্ত করেছেন শিশু ও যুবকরা। গত মঙ্গলবার (১০ মার্চ) খুলনার সিএসএস আভা সেন্টারে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনে ৭০ জন শিশু ও যুবরা অংশ নেন। ওয়ার্ল্ড ভিশনের খুলনা শহর এরিয়া প্রোগ্রাম এ অনুষ্ঠান আয়োজন করে। কেসিসির ৩১টি ওয়ার্ডে পৃথকভাবে শিশু ও যুব ফোরাম রয়েছে। প্রতিটি শিশু ফোরামে ১৫ জন ও যুব ফোরামে ১৩ করে সদস্য রয়েছে। এ হিসেবে ৮৯৬ জন শিশু ও যুবক কেসিসির ৩১টি ওয়ার্ডের ফোরামে যুক্ত রয়েছে। অনুষ্টান শেষে কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এ মধ্য দিয়ে ১০ জনকে পুরস্কার দেয়া হয়।
প্রোগ্রামের সিনিয়র ম্যানেজার ফুলি সরকার বলেন, শিশুসহ ঝুকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রকল্প নিয়ে কাজ চলছে। এরই অংশ হিসেবে শিশু ও যুব ফোরাম কাজ করছে। যা কেসিসির ৩১টি ওয়ার্ডেই বিস্তার রয়েছে। ২০৩৫ সাল পর্যন্ত এ উন্নয়নমুলক কাজ চলবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে শিশু ও যুবকদের উন্নয়নসহ সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযোগ করা হচ্ছে। যাতে এই শিশু ও যুবরা সচেতন হয়ে বাল্য বিয়ে বন্ধ, শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, স্কুল থেকে ঝড়ে পরা রোধসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। ৩ মাসে এই ফোরাম ৬টি বাল্য বিয়ে প্রতিরোধ করেছে। প্রতিবন্ধীদের নিয়েও এই ফোরাম কাজ করছে। তিনি বলেন, খুলনায় রেজিস্ট্রার শিশু রয়েছে ৪ হাজার। ২০২৭ সালে এ সংখ্যা ৮ হাজারে উপনীত হবে।
ন্যাশনাল চাইল্ড ফোরাম সদস্য সামিয়া জান্নাত বলেন, এই ফোরামে আসার কারণেই শিশুদের জন্য কাজ করতে পারছি। সমাজের সমস্যা নিয়ে ভাবছি ও সমাধানে ভুমিকা নিচ্ছি। ১০টি বাল্য বিয়ে বন্ধ করেছি। ৫০০টি গাছ রোপন করেছি। ২৫ মন প্লাস্টিক সংগ্রহ ও সংরক্ষণে পদক্ষেপ নিয়েছি। শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে চাই। প্রতিটি শিশুর স্বপ্ন পুরন হবে।
জাতীয় শিশু ও যুব ফোরামের সেক্রেটারি আকাশ মজুমদার বলেন, শিশু ফোরাম থেকেই যাত্রা শুরু। সুন্দরভাবে কথা বলা৷ মন ও মানষিক পরিবর্তন এ ফোরাম থেকেই এসেছে। একটি শিশু বাল্য বিয়ের মধ্যে ঢুকে গেলে তার যন্ত্রণার শেষ থাকে না। এই ফোরাম বাল্য বিয়ে বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। এ ফোরাম সমাজের সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলে।
যুব ফোরামের সহ সভাপতি আফরোজা আক্তার স্বর্নালী বলেন, আমাদের দায়িত্ব শুধু নিজের জন্য না, সমাজ বদলেও আমাদের বৃহৎ ভুমিকা রয়েছে। এই ফোরামের মাধ্যমে আমরা শিশুরা নিজেকে তৈরী, শিশু বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারছি। ক্লিনিং ডে পালনের মাধ্যমে আমরা পরিবেশ পরিচ্ছন্নতার কাজ করি। সকলেই পড়াশোনার পাশাপাশি এ কাজ করে থাকে।
কুয়েট সহকারী অধ্যাপক ড. আনজুম তাসনুভা জলবায়ু পরিবর্তন ও নিজেকে মানিয়ে নেয়ার বিষয় নিয়ে মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আমরা জীবন্ত কিছু প্রভাবে বুজতে পারি। দেশের ফুল ফোটার সময় বসন্ত হলেও অন্য সময়ে চলে যাচ্ছে। কোকিলের ডিমপাড়ার সময়ে পরিবর্তন দেখা যায়। গ্রীন হাউজ গ্যাস বেড়ে যাওয়ার কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি হয়, বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন দেখা যায়।
তিনি বলেন, একটা সমস্যা থেকে আরেক সমস্যা দেখা দেয়। দুর্যোগ দেখা দেয়। ভুমিকম্পের মাত্রা বাড়ছে। সাইক্লোনের ফলে জলোচ্ছ্বাস হয়ে লোকালয়ে লবণ পানি ঢুকছে, এতে সুপেয় খাবার পানি, কৃষির সেচের মিষ্টি পানি, গোসলের জন্য মিষ্টি পানির আধার নষ্ট হয়। ফসলের উৎপাদন কমে আসে। কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব পরে। মানুষের আয়ের ওপর নেতিবাচকতা সৃষ্টি হয়। শিশুর শিক্ষা বিঘ্নিত হয়। ঝরে পড়া শিশু বাড়ে, বাল্য বিয়ের হার বাড়ে, দ্রুত ডিভোর্স হচ্ছে, পরিবার সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ সবই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। এ পরিবর্তন মোকাবেলা করতে হবে টেকসই পদ্ধতিতে। সেই পরিবর্তনের জন্য যুব শক্তিকে পদক্ষেপ নিতে হবে। যুব শক্তির সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সহায়ক হবে।
খুলনার নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মো: মোখলেসুর রহমান বলেন, শরীর সুস্থ রাখতে হলে নিরাপদ খাদ্য প্রয়োজন। পানির মাধ্যমেই শরীরে রোগ বেশি ছড়ায়। নিরাপদ পানি নেই, কোন খাবারই নিরাপদ নয়। কিন্তু খাইতে হবে। আবার সুস্থও থাকতে হবে। তিনি বলেন, রান্নায় আগুনের তাপে সবজির জীবানু নষ্ট হয়। কিন্তু সবজিতে ব্যবহার করা কীটনাশক নষ্ট হয় না। তাই সবজি ১০-১৫ মিনিট ডুবন্ত পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। তাহলে সবজি কীটনাশক মুক্ত হবে।
রূপান্তরের পরিচালক স্বপন গুহ বলেন, শিশু ও যুবকরাই আগামীর নেতৃত্ব দিবে। এখন থেকেই আগামীর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। জেনে বুঝে সচেতন হয়েই পদক্ষেপগুলো নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয় জানার পাশাপাশি মোকাবেলায় করণীয়ও জানতে হবে, সচেতন হতে হবে। টেকনোলজি নিয়ে মেতে থাকা যাবে না। টেকনোলজিকে ব্যবহার করতে হবে। সাইবার বুলিংয়ের শিকার এই শিশু ও যুবরা। এর কারণ এরা টেকনোলজির দ্বারা পরিচালিত হয়। এ থেকে সতর্ক হতে হবে।
খুলনা মহিলা বিষয়ক উপ পরিচালক সুরাইয়া সিদ্দিকা বলেন, শহর এলাকা, বা উপজেলা সদরের বাইরে দুর্গম এলাকায় বাল্য বিয়ে হওয়ার আগে জানা যায় না। বিয়ে হওয়ার ৪/৫ দিন পর জানা যায়। এটা যোগাযোগ সমস্যার কারণেই হয়। আর সচেতনতার অভাবও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নও টেকে না। জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাবের কারণে এমন হাজারো সমস্যা দেখা দেয়। তাই আমরা সচেতনতা সৃষ্টিতে জোর দিতে পারি।
তিনি আরো বলেন, সচেতনতা বাড়লে যোগাযোগ সমস্যা সমস্যা হবে না। তিনি বলেন, পিতা মাতা সন্তানের ভালো চান, তাই সব বিষয় নজরদারি করেন। শিশুরা আবেগী হয়ে মা বাবাকে এড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ঝুকিতে পরে। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয় মাতা পিতা। তাই প্রতিটি শিশুর উচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে বিষয়গুলো নিয়ে মা বাবার সাথে আলোচনা করা। তাহলে মা বাবাই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবেন। তাই আগেই ভাবতে হবে, ভেবে ক্ষতির ঝুকিতে পরা যাবে না। তাই পড়াশোনা করে আগে ক্যারিয়ার নিশ্চিত করতে হবে। সবাইকে ভালো থাকতে হলে সকলকে ভালো হতে হবে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর খুলনার সহকারী পরিচালক এস এম বদিউজ্জামাল বলেন, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে ৮৬টি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়। কম্পিউটার বেসিক থেকে ডাটা এন্ট্রি, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ফ্রীল্যান্সিং কোর্সসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ বিনামুল্যে দেয়া হয়। প্রশিক্ষনার্থী টাকাও পায়। সরকার যুব সমাজকে উন্নয়নে কাজ করছে। সেলাই, ব্লক বাটিক, হস্তশিল্প, ফ্যাশন ডিজাইন, বিউটিফিকেশনসহ নানা বিষয়ে মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। মৎস্য, কৃষি, গবাদী পশু পালন, ইলেক্ট্রনিক, মোবাইল, ইযথ কিচেনে রান্নাবান্নাসহ নানা প্রশিক্ষণ রয়েছে। ৫০ টাকায় ভর্তি ফিতে এ সকল প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি বিকল্প কিছু শিখতে হবে। স্কিল ডেভেলপ করতে হবে।
পিবিআই খুলনার পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন বলেন, সাইবার বুলিং ড্রাগ এডিকশন থেকেও ভয়ঙ্কর। সাইবার বুলিংয়ের শিকার ছেলে মেয়ে সকলেই। কিন্তু বেশি শিকার হচ্ছে মেয়েরা। এখন পুলিশের চেয়ে বেশি সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয় না। আগে ছেলে মেয়েদের নিয়ে চিন্তা থাকতো। ছেলেটা কোথায় কি করছে, মেয়েটা কি ঠিকমত ক্লাসে আছে। এখন ছেলে মেয়েদের ঘর থেকে বের করা যায় না। ক্লাস নাইনে পড়া মেয়ে ফলোয়ার বাড়াতে গিয়ে সাইবার বুলিংয়ের মুখে পড়ছে। অজ্ঞতা ও লোভ থেকে এ সমস্যা বাড়ছে। বড়দের যেটা প্রয়োজন, শিশু যুবদের কাছে সেটা প্রিয়জন হয়ে গেছে। টেকনোলজিকে প্রয়োজনে ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু প্রিয়জন বানানো যাবে না।
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সরকার প্রথম বছর ৫ কোটি গাছের চারা রোপন করবে। কেসিসি এলাকার ৩১টি ওয়ার্ডে এই ফোরামের সহযোগিতা নিয়ে গাছে চারা রোপনকে গতিশীল করতে চাই। এতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় করণীয় বিষয়ে শিশু ও যুবদের সচেতনতার পাশাপাশি বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান বাড়বে। শিশু ও যুবরা উজ্জীবিত হবে। ফোরামের সহযোগিতায় কেসিসির নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্দোগ নেয়া হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত