মানজারুল ইসলাম
ওই জামাটার দাম কতো? ক্রেতার এমন প্রশ্নের বিপরীতে বিক্রেতার উত্তর "একদাম ১২০০ টাকা"। ক্রেতা কিছু সময় মনে মনে হিসেব কষে উত্তর দিলেন "ভাই ৫০০ তে দেয়া যাবে?" বিক্রেতার "না" জবাবে পাশের দোকানে গেলেন ক্রেতা মেহেদী হাসান। প্রায় দু'ঘন্টা খুলনার রেলওয়ে মার্কেটে এ দোকান থেকে অপর দোকান ঘুরেও ঈদ কেনাকাটা কিছুই করতে পারেননি তিনি। কারণ করোনায় বেতন কমেছে প্রায় অর্ধেক, অপরদিকে খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। করোনা পরবর্তী ঈদ বাজারে এমন হিসেব কষছেন অনেকেই। সাধ আর সাধ্যের সমন্বয়হীনতার মাঝেও ঈদের কেনাকাটা করছেন সবাই।

দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদ-উল-ফিতর। মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের প্রধান এ উৎসব আসতে আর মাত্র কয়েকদিন বাকী। রোজার শেষ পর্যায়ে এ মূহুর্তে জমে উঠেছে খুলনার সকল ঈদ বাজার। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সীদের পদচারনায় মুখরিত হয়ে উঠেছে খুলনার বিপনী বিতান ও মার্কেটপাড়া। ক্রেতাদের উপচে পরা ভিড় হওয়ায় দম ফেলার ফুসরত নেই বিক্রেতাদেরও।
শুক্রবার (২২ এপ্রিল) খুলনা নগরীর নিউ মার্কেট, শপিং কমপ্লেক্স, জলিল মার্কেট, হকার্স মার্কেট, শিববাড়ী মোড়ের শোরুম, সোনাডাঙ্গার শো রুম, ডাকবাংলা মোড়, রেলওয়ে মার্কেট, পিকচার প্যালেস মোড়, বড় বাজার, মশিউর রহমান মার্কেট, কবি কাজী নজরুল ইসলাম মার্কেট, এস এম এ রব মার্কেট, দরবেশ চেম্বার, নান্নু সুপার মার্কেট, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মার্কেট, নিক্সন মার্কেট, হকার্স মার্কেট, হাজী মালেক চেম্বার, নূর চেম্বার, এশা চেম্বার, আড়ং, অঞ্জনস ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি মার্কেট এলাকা ও বিপনী বিতানগুলোতে ঈদের আমেজ বইছে। সব ধরণের ক্রেতা সমাগমে মুখরিত হয়ে উঠেছে দোকানপাট। শেষ মূহুর্তে বেচাকেনায় যেনো ধুম পরেছে।
ক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এবারের ঈদ বাজারের চিত্রটা অন্যবারের তুলনায় পুরোপুরি ভিন্ন। করোনার প্রকোপে গত ২ বছর ঈদে প্রিয়জনের জন্য তেমন কেনাকাটা করতে পারেননি সবাই। তাই এ বছর বাড়তি অাগ্রহের কেন্দ্রে থাকছে ঈদের কেনাকাটা। তবে করোনার ধাক্কা সামলে উঠতে গিয়ে কেনাকাটায় হিমশিম খাচ্ছেন অনেকেই। উচ্চবিত্ত শ্রেণীর ক্রেতারা প্রাধান্য সময়ের সেরা ফ্যাশন ও আভিজাত্য । মধ্যবিত্তরা করোনার ধকল সামলাতে ব্যস্ত, তাই বাজেট কষে ঈদ কেনাকাটায় পরিবারের আপনজনদের সামান্য কিছু দিতে পারলেই খুশি। এদিকটায় মোটামুটি খোশমেজাজে নিম্নবিত্তরাও। কারণ করোনায় ত্রাণ ও অর্থ সহায়তা পাওয়ায় খুব বেশী বেগ পেতে হচ্ছেনা তাদের।
খুলনার শিববাড়ী মোড়ের ইয়োলোর শো রুমে আসা ক্রেতা শারাফাত হোসেন প্রতিদিন সেবককে বলেন, "এবার বন্ধুদের সাথে প্ল্যান ছিলো কলকাতায় ঈদ শপিং করবো। ২৫ রোজার পরে অামাদের প্ল্যান। মার্কেট যাচাইয়ের জন্য এসেছি। ঈদে তো কয়েকটা ড্রেস লাগবে। অাগে অাড়ংয়ে ঘুরে এখন শিববাড়ীর শো-রুমে এলাম, এরপর একটু নিউ মার্কেটেও যাবো।"
খুলনার রেলওয়ে মার্কেটে কথা হয় বেসরকারি চাকুরিজীবী মেহেদী হাসানের সাথে। তিনি প্রতিদিন সেবককে বলেন, "২০২০ সালে করোনার শুরুতেই অামার চাকরী চলে যায়। সামান্য কিছু সঞ্চয় ছিলো সাথে ধারদেনা করে চলেছি ওই পুরো বছরটা। ২০২১ সালে ওই অফিসেই অামাকে অাবার ডেকে নেয়। তবে বেতন অাগের অর্ধেক। করোনার অাগে বেতন পেতাম ১৮ হাজার, এখন পাই ১০ হাজার। তার উপরে বাজারের সব জিনিসের দাম বেশী। প্রতিমাসে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা দেনা শোধ করতে হয়। বাকী টাকা দিয়ে ঘর ভাড়া অার বাজার হয়না। তাই নতুন করে ধারদেনার চেষ্টা করি। বেতন থেকে ২ হাজার অার ২ হাজার টাকা ধার করে এনেছি। ঈদে নিজের জন্য কিছু না নিলেও অামার দুইটা বাচ্চার জন্য অার বউয়ের জন্য কিছু কিনবো। কিন্তু বাজেটে মিলাতে পারছিনা বলে মার্কেটে ঘুরতেছি।"
নগরীর ডাকবাংলা মোড়ে ফুটপাত থেকে এক জোড়া জুতা কিনেছেন রিক্সাচালক অাফজাল শেখ। তিনি প্রতিদিন সেবককে বলেন, "ডেইলি রিক্সা চালাই- ডেইলি মার্কিটিং (কেনাকাটা) করি। দুইদিন অাগে বাচ্চাগো জন্যি জামা কিনসি। অাইজ জুতা কিনলাম। এহনো তো দশ দিন অাছে হাতে। রোজার মধ্যি অায় ইনকাম খারাপ না। রোজার শ্যাষে অামরা লুঙ্গি অার বউর শাড়ি কেনবানি।"
অপরদিকে ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মার্কেটগুলো পুরোপুরি জমে না উঠলেও ঈদে কেনাকাটা করতে আসা ক্রেতাদের চাপে হিমশিম খাচ্ছে ব্যবসায়ীরা। গত দু'বছর ঈদ বাজারে ভাটা পরায় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চান বিক্রেতারা। তবে ব্যবসায়ীদের লাভের অাশায় বাধ সেধেছে কলকাতামুখী ঈদ বাজার। বছর জুড়ে ঈদের জন্য অপেক্ষা করেন ব্যবসায়ীরা। রমজান আসার আগে থেকে প্রস্তুতিও শুরু হয় জোরেশোরে। ঘাটতি পুষিয়ে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করাই ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য। কিন্তু ব্যবসায়ীদের হতাশ করে এবার রোজায় ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করায় অপেক্ষাকৃত উচ্চবিত্তদের ঈদবাজার কলকাতামুখী। আশানুরুপ বিক্রি না হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কাও করছেন ব্যবসায়ীরা।
খুলনা নিউ মার্কেটের জামদানী হাউজের স্বত্তাধিকারী আব্দুল হালিম মিয়া প্রতিদিন সেবককে বলেন, "করোনার কারণে গত ২ বছর খুলনার বেচাকেনায় ভাটা পরেছিলো।এবছর ক্ষতি পুষিয়ে নেবার অাশা করেছিলাম। কিন্তু রোজার শুরুতেই ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হওয়ায় ঈদকে কেন্দ্র করে কলকাতার ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো ব্যবসা হচ্ছে। লস হবে অামাদের।"
ব্যবসায়ীদের কথার কাছে কিছুটা সহমত পোষণ করেন খুলনা রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার মানিক চন্দ্র সরকার। তিনি প্রতিদিন সেবককে বলেন, "রোজায় শুরু থেকেই বেনাপোলগামী ট্রেনে যাত্রীর চাপ বেড়েছে। প্রতিদিন ভোর ৬ টা ও বেলা ১২টার দুথটি কমিউটার ট্রেনেই যাত্রীদের চাপে তিল ধারণের জায়গা থাকেনা। অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ট্রেন যাতায়াত করছে। যাত্রীরা ফেরার সময়ে অনেক ব্যাগ ব্যাগেজ ভরে নিয়ে অাসছেন। ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হওয়ার পর থেকেই এমন যাত্রীদের চাপ বেড়েছে বলেও জানান তিনি।"
তবে অপেক্ষাকৃত মধ্যবিত্ত ও নিন্মবিত্তদের মার্কেট খ্যাত নিক্সন মার্কেটের নিউ ফ্যাশন স্টোরের ব্যবসায়ী সাব্বির আহমেদ প্রতিদিন সেবককে বলেন, "ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে ততই ক্রেতাদের চাপ বাড়ছে। ক্রেতাদের চাপে দম ফেলার ফুসরত নেই। এ বছর রোজার প্রথম দিকে বিক্রি ভালো না হলেও শেষের এ সময়টায় আশানুরুপ বিক্রি হচ্ছে।।"
খুলনা নিউ মার্কেট মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল গাফফার বিশ্বাস প্রতিদিন সেবককে বলেন, নিউ মার্কেটে শহরের অপেক্ষাকৃত অভিজাত পরিবারের মানুষেরা কেনাকাটা করে। এখানে বিভিন্ন দেশ থেকে পোষাক, জুতা, কাপড়সহ সবকিছু অাসে। ব্যবসায়ীরা ঈদকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে বিনিয়োগ করে। কিন্তু সে অনুযায়ী বিক্রি নেই তাদের। ব্যবসায়ীরা সঠিক নিয়মে রাজস্ব দিয়ে পণ্য এনে বিক্রি করছে, কিন্তু ক্রেতারা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কেনাকাটা করে আনছে। দেশের ঈদ বাজার এভাবে কলকাতামুখী হয়ে গেলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পরবে।

খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি কাজী আমিনুল হক প্রতিদিন সেবককে বলেন, "খুলনার ডাকবাংলা, শপিং কমপ্লেক্স, বড়বাজার কেন্দ্রিক সব ধরনের মার্কেটে ঈদ উপলক্ষে ক্রেতাদের ভীষণ চাপ। গত দুই বছর করোনার কারণে ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। কিন্তু এ বছর করোনার প্রকোপ অনেকটা শিথিল হওয়ায় ব্যবসায়ীরা লাভের মুখ দেখছেন আলহামদুলিল্লাহ। আশা করছি ব্যবসায়ীরা তাদের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবেন।"
এদিকে ক্রেতারা যাতে নির্বিঘ্নে কেনাকাটা করতে পারে এজন্য খুলনায় কেএমপিথর পক্ষ থেকে বিশেষ সতর্কতা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রতিটি মার্কেটেই পর্যাপ্ত পুলিশ টহল দিচ্ছে। বাড়ানো হয়েছে প্যাট্রলিং টিম।
কেএমপি সূত্র জানায়, ঈদকে কেন্দ্র করে খুলনার প্রতিটি বিপনী কেন্দ্র, মার্কেট ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের আশপাশে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আশা করা যায় ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত ক্রেতারা কোনো সমস্যা ছাড়াই কেনাকাটা করতে পারবে।
এমআই/এএপি/পিএসএন
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত