আগে গ্রামের একটি নাম থাকলেও এখন জুয়াড়ি গ্রাম হিসেবেই সকলের কাছে পরিচিত। ১৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সী সকলেই জুয়ায় আসক্ত। তাদের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী, শিক্ষার্থীও রয়েছে। যারা নিজেদের বেতনের টাকায় জুয়া খেলে। তাদের কারও নামে প্রায় দেড় থেকে দুইশ’ করে অনলাইন জুয়ার ওয়েব অ্যাকাউন্ট রয়েছে। সম্প্রতি জুয়াড়ি চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তারের পরে এমনই এক গ্রামের সন্ধান পেয়েছে মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের সাইবার পুলিশ। মহানগর গোয়েন্দা সাইবার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি রাজধানীর একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হওয়া মামলা তদন্ত শুরু করলে অনলাইন জুয়া চক্রের দুই সদস্য সবুজ সরকার এবং মেহেদী হাসানকে জামালপুর থেকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার বিভাগ। তাদের মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া চক্রের মূলহোতা মো. সবুজের নিজস্ব প্রায় ২০০টি জুয়ার ওয়েবসাইট রয়েছে। তার মুঠোফোন তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদে এখন পর্যন্ত মোট ১৮০টি অনলাইন জুয়ার অ্যাকাউন্টের সন্ধান পেয়েছে গোয়েন্দা বিভাগ।
এই জুয়ার সাইটগুলো সে একাই পরিচালনা করতো। সূত্র জানায়, জামালপুরের সরিষাবাড়ীর পশ্চিমপাড়া গ্রামের বেশির ভাগ বাসিন্দা এখন অনলাইন জুয়ায় আসক্ত।
অনলাইন জুয়া এখন তাদের কাছে এক ধরনের নেশায় পরিণত হয়েছে। তাদের মধ্যে শিক্ষার্থী, সরকারি চাকরিজীবী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি রয়েছে। অর্থাৎ এই গ্রামের ১৫ বছর বয়স থেকে শুরু করে ৬৫ বছর পর্যন্ত সকলেই জুয়ার নেশায় আসক্ত। তাদের মধ্যে চাকরিজীবী যারা জুয়ায় আসক্ত তারা মাস শেষে যে বেতন পান সেটাও অনলাইন জুয়ার পেছনেই খরচ করেন। কখনো কখনো আবার সহকর্মীদের কাছ থেকে টাকা ধার করে জুয়া খেলেন। জুয়ার কারণে তাদের অনেকেরই স্ত্রী চলে গেছে। সংসার ভেঙেছে। মারামারি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধে লিপ্ত তারা। সূত্র জানায়, অনলাইন জুয়া চক্রের নাটেরগুরু সবুজ। তার হাত ধরেই গত ৫ বছর ধরে এলাকায় ছড়িয়েছে জুয়া। এর আগে অনেকেরই নিজস্ব স্মার্ট ফোনও ছিল না। সবুজের মতো অসংখ্য জুয়াড়ির মাধ্যমে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় জুয়া এখন অফলাইন ছেড়ে অনলাইনে। রাজধানীর ও জেলা শহরের সীমানা পেরিয়ে এখন প্রত্যন্ত মফস্বল শহর-গ্রামে পৌঁছেছে অনলাইন জুয়া। সবুজসহ গ্রামের একাধিক জুয়াড়ি অনলাইন জুয়ার নামে আত্মসাৎ এবং পাচার করেছে কোটি কোটি টাকা।
গত পাঁচ বছরে সবুজ প্রায় পাঁচ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র। সূত্র জানায়, জুয়ায় আসক্ত হয়ে কেবল সর্বস্বান্ত হচ্ছে না, জুয়ার টাকা জোগাড় করতে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না জুয়াড়িরা। গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে সবুজ জানায়, সে একটি কারিগরি প্রতিষ্ঠান থেকে পড়ালেখা শেষে গ্রাফিক ডিজাইন থেকে শুরু করে কম্পিউটারের ওপর একাধিক কোর্স করে। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের নামে শতাধিক অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট খুলে মাসিক ভিত্তিতে গ্রামের মানুষের কাছে ভাড়া দিয়ে থাকে। প্রতিটি ওয়েবসাইটের বিপরীতে সবুজ মাসে ২৫ হাজার টাকা নিতো এবং তার থেকে যারা ওয়েবসাইট ভাড়া নিয়ে খেলতো সেখান থেকেও ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ নিতো। এভাবেই তিনি গ্রামের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সকলের মধ্যে অনলাইন জুয়া ছড়িয়ে দেন। তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া মেহেদী হাসানও একজন অনলাইন জুয়াড়ি।
তিনি নিজের জুয়ার সাইট পরিচালনার পাশাপাশি সবুজের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। এ বিষয়ে মহানগর ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ তারেক বিন রশিদ বলেন, অনলাইন জুয়া চক্রের মূলহোতা সবুজই মূলত সবগুলো জুয়ার অনলাইন ওয়েবসাইট পরিচালনা করে থাকে। তার থেকে গ্রামের সাধারণ মানুষ ওয়েবসাইট ভাড়া নিয়ে জুয়া খেলে। জুয়া খেলার মাধ্যমে কে কতো টাকা আয় করছে তার সব হিসাব তার কাছে রয়েছে। তিনি মাসিক ভাড়ার পাশাপাশি জুয়ার লাভের টাকার অর্ধেক নিয়ে নিতেন। সর্বনাশা এই অনলাইন জুয়ার কবল থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে সবার আগে পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি ব্যক্তি সচেতনতার বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
পিএসএন/এমআই
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত