
নিশ্চয়ই আল্লাহর কোন পরিকল্পনা আছে, সকল কষ্ট এবং দুঃখে আলহামদুলিল্লাহ- হত্যার পর ফেসবুকে বাবার পোস্ট
খুলনা নগরীর চাঞ্চল্যকর আরফানা হোসেন নির্জনা হত্যাকাণ্ডের রহস্য ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে উদঘাটন করেছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি)। আজ শনিবার সকালে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, ঘটনার ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশের একটি আভিযানিক দল নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সীমাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন যে, মেয়ের সাথে বিভিন্ন ছেলেদের প্রেমের সম্পর্ক থাকার কারণে পারিবারিক কলহের সৃষ্টি হয় এবং এই কলহকে কেন্দ্র করেই তাদের একমাত্র মেয়েকে হত্যা করা হয়।
মা এর জবানবন্দী থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন বিকেলে পরিবারের সাথে নির্জনার বাকবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে মা তাকে কয়েকটি চড়-থাপ্পড় মারেন। ঘরের ভেতর শোরগোল শুনে বাবা আলীম হোসেন আকাশ সেখানে এসে তাদের চুপ করতে বলেন। কিন্তু মেয়ে শান্ত না হওয়ায় একটি কাঠের চলা দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়, যার ফলে ঘটনাস্থলেই নির্জনার মৃত্যু হয়। হত্যাকাণ্ডের পর বাবা ও মা মিলে মেয়ের লাশ একটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে এবং ছেঁড়া লুঙ্গি দিয়ে পেঁচিয়ে বাবা মোটরসাইকেলে করে নিরালার প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার একটি নিরিবিলি রাস্তায় ফেলে রেখে আসে।
মায়ের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তেরখাদা আজগড়া এলাকায় একটি ছেলের সাথে তার বিয়ে করায় তারা ক্ষুব্ধ ছিল। শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার জন্য ওই দিন সকালে মেয়েটি বাড়ি থেকে বের হয়।
পরবর্তীতে তাকে বুঝিয়ে বাড়িতে ফিরে আনা হয়। বিকেলে এঘটনা ঘটে ।

গত ৮ জুলাই রাতে ওই স্থান থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় নির্জনার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সুরতহালকারী পুলিশ কর্মকর্তা এসআই লাভলী পাল জানান, নির্জনার মাথার ডান ও বাম পাশে আঘাতের গভীর ক্ষত ছিল এবং গলায় কালো দাগ পাওয়া গিয়েছিল। মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ গতকাল ১০ জুলাই সদর থানায় মামলা দায়ের করে। শুক্রবার মহানগর হাকিম ইব্রাহীম খলিল মুহিমের আদালতে নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সীমা দায় স্বীকার করে জবানবন্দি প্রদান করেন এবং এরপর তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, নিহতের বাবা মো. আলীম হোসেন আকাশ ঘটনার পর থেকেই পলাতক রয়েছেন এবং তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে নির্জনার মা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে মেয়ের লাশ শনাক্ত করেন। ওই সময় তিনি দাবি করেছিলেন, বাড়ি ছাড়ার আগে তার মেয়ে একটি চিঠি লিখেছিল, যাতে লেখা ছিল—‘আমার কোনো খোঁজখবর তোমরা নিও না’।
এদিকে, বাবা আলীম হোসেন আকাশ পলাতক থাকলেও ফেসবুকের মাধ্যমে তিনি বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন। তিনি একটি স্ট্যাটাসের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে তার মেয়ে স্বেচ্ছায় ঘর থেকে চলে গিয়েছিল এবং এর সপক্ষে একটি চিঠিও প্রকাশ করেন। তবে পুলিশ জানায়, চিঠির সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। যেদিন রাতে নির্জনার লাশ পাওয়া যায়, ঠিক সেই সময়েই তার বাবার ফেসবুক আইডি থেকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়া হয়, যেখানে লেখা ছিল—‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কোনো পরিকল্পনা আছে, সকল কষ্ট এবং দুঃখে আলহামদুলিল্লাহ’।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলীম হোসেন আকাশের প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা যায়, তিনি নিয়মিত টিকটকার হিসেবে সক্রিয় ছিলেন এবং স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বিভিন্ন টিকটক ভিডিও তৈরি করে ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করতেন। তিনি নিজেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ও ব্যবসায়ী হিসেবে দাবি করলেও তার পেশার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান জানান, প্রাথমিক তদন্তে তাদের ধারণা নির্জনার বাবা একজন মাদকাসক্ত। বর্তমানে পলাতক বাবাকে খুঁজে বের করতে পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে।
এদিকে খুলনায় এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনায় জনমনে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন প্রশ্ন ও রহস্য। বিশেষ করে বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হিসেবে কি করে তারা তাদের সন্তানকে হত্যা করতে পারে এমন প্রশ্ন করছেন অনেকে। খুলনায় এমন ঘটনা এই প্রথম বলেও মনে করছেন অনেকে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত