সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সময় চেয়েছিলেন ৪৮ ঘণ্টা। কিন্তু সেই ঘণ্টা ঠেকেছে কয়েক হাজার ঘণ্টায়। বছর হিসাবে ১০ বছরেও উদ্ঘাটন হয়নি হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ। খোঁজ মেলেনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের। এরইমধ্যে ৯০ বার পিছিয়েছে হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ। আগামী ২৪শে আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। তবে পরিবার তদন্তের প্রতি ক্ষুব্ধ। তাদের এই বিচারের প্রতি আস্থা ও আশা এখন আর নেই। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বিচার না পাওয়ার দুটি কারণ দাবি করেন রুনির পরিবার। রুনির ভাই নওশের আলম বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে হয় তদন্তকারী সংস্থা ব্যর্থ হয়েছে না হয় এই ঘটনার সঙ্গে এমন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত যা সরকার ও তদন্তকারীরা উদ্ঘাটন করতে চান না।
এক দশকে কেন উদ্ঘাটন করা গেল না এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য? তদন্ত এখনও শেষ হয়নি, বিচার তো বহু দূরের কথা। তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ বার বার পেছানোর কোনো কারণও আমাদের কাছে বলছেন না তদন্তকারী সংস্থা। তদন্ত প্রক্রিয়া এভাবে পেছানোয় ভোগান্তিসহ মানসিকভাবে অসুস্থ হতে হচ্ছে। ছোট মেঘও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। সে দেখতে চায় তার বাবা-মায়ের হত্যার বিচার।
তিনি বলেন, এই হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা তদন্ত প্রতিবেদন জমা বার বার পিছিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমাদের কাছে কিছুই বলে না। তারা সবসময় বলে চেষ্টা করছে। আমাদের কাছে যেটা মনে হয় যে আসলে এটা তদন্তকারী সংস্থা ও সরকারের এই মামলার বিচারের বিষয়ে অনাগ্রহের কারণেই এভাবে বার বার পিছিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমার মনে হয় না তদন্তকারী সংস্থা কোনো প্রকার তদন্ত করছে। এই ১০ বছরের গত আট, নয় বছর ধরে কোনো তদন্ত হচ্ছে বলে মনে হয় না। হতে পারে এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে এমন কেউ জড়িয়ে আছে। তাদের বাঁচানোর জন্য হোক অথবা তদন্তকারী সংস্থা ব্যর্থ। তারা উদ্ঘাটন করতে পারেনি বলে হয়তো নানাভাবে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে। আমরা নিজেদের আপনজন হারিয়েছি এবং তাদের মৃত্যুর বিচার না পাওয়াটা আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের। আমার মা তার মেয়েকে হারিয়ে বিচার না পেয়ে মারাও গেলেন। ঘটনার শুরুর দিক থেকেই তদন্তকারী সংশ্লিষ্টরা খুব হয়রানি করতো। এখন হয়তো হয়রানি সরাসরি না করলেও তারা এই যে তদন্ত প্রক্রিয়া পেছাচ্ছে বার বার এটা তো এক ধরনের মানসিক একটা অত্যাচারের মতোই। নতুন যে তারিখ আবার নির্ধারণ করা হয়েছে তাতেও কোনো ভরসা বা আশা দেখছি না। পেছানোর জন্য এতদূরে আসতে হয় না। গত দশ বছরে এমন একটা আলোচিত মামলা, যার এত ক্লু আছে বা যেটা ছিল সেটি তদন্ত করতে না পারাই তো তদন্তকারী সংস্থার ব্যর্থতা। তদন্তকারী সংস্থা চাইলে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারে। অনেক জায়গায় সেটি দেখেছি। আমরা সারাজীবন চাইবো বিচার হোক কিন্তু আশা নেই আর। প্রথমদিকে হয়তো ছিল কিন্তু এখন আর বিচারের প্রতি কোনো আস্থা কাজ করে না।
নওশের আলম বলেন, আমার মা সবসময় বিচার চাইতেন। ঘটনার এত বছরে নিজের মেয়ের মৃত্যুর ব্যথা এবং বিচার না পাওয়া তাকে শুধু কষ্টই দিয়েছে। সবসময় তিনি চেয়েছেন মেঘ যেন বিচারটি দেখে। তদন্তকারী সংস্থা এখন আমাদের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করে না। সাংবাদিক নেতারা প্রতি বছর মৃত্যুবার্ষিকীতে একটা আয়োজন করেন। তখন তারা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চায় এতটুকুই। সরকারের কোনো ইচ্ছা নেই এই হত্যাকাণ্ডের বিচার করার। নিশ্চয়ই এটায় এমন কিছু ছিল যে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে এবং বিচার থেকে দূরে রেখেছে।
তিনি আরও বলেন, যে প্রক্রিয়ায় তদন্ত প্রক্রিয়া চলছে তাতে আমরা বিচার পাওয়ার আশা করি না। তদন্তকারী সংস্থা বা সরকারের আন্তরিকতার এত অভাব দেখেছি যে বিচার পাওয়ার আশা নেই। আমরা স্বজন হারিয়েছি যার ফলে সবসময় মনে হয় যে বিচার পাবো। মনে হয় আমরা বিচার পাবোই। এই ধরনের ক্ষীণ আশা সবসময় থাকবে এবং সারাজীবনই এটা থাকবে। বিচার আমরা সবসময় চাইবো।
পিএসএন/এমআই
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত