
খুলনা (২৬ সেপ্টেম্বর)
কয়েক দফা ঠিকাদার বদলের পর অবশেষে খুলনার দাকোপে নির্মানধীন মূল গার্ডার ব্রীজের বর্ধিত করণের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। ইতি মধ্যে শেষ হয়েছে ব্রীজের সংযোগ সড়কের কাজও। শুরু হয়েছে ব্রীজের উপর দিয়ে যানবাহন চলাচল। ৫০ কোটি ৭৫ লাখ ৯ হাজার ২৩৮ টাকা ব্যয় ব্রীজটি নির্মিত হয়েছে উপজেলার দাকোপ ইউনিয়নের শিংজোড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কালিনগর বাজার সংলগ্ন ভদ্রা নদীর উপর। আর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ব্রীজটির উদ্বোধন হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্রীজটি সচল হওয়ায় মোংলা পোর্ট ও উপজেলা সদরের সাথে সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী উপজেলা পাইকগাছা, কয়রা থেকে মোংলা বন্দরের সঙ্গেও যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটা সুগম হবে। প্রত্যক্ষভাবে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ উপকৃত হবেন। এছাড়া স্বপ্নের এই ব্রীজটি এক নজর দেখার জন্য প্রতিদিন বিকালে শত শত লোকের ভিড় জমছে।
এলাকাবাসি সূত্রে জানা গেছে, পৃথক তিনটি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত এই উপজেলা। দ্বীপ তিনটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩১, ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডার নামে পরিচিত। এখানে একটি পোল্ডার থেকে অন্য পোল্ডারে যেতে হলে খেয়া পারাপারে সংখ্যাই বেশি। ব্রীজটি সচল হওয়ায় ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডারের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে। এতে এলাকার ব্যবসা বাণিজ্যের গতিও বাড়বে। কৃষকের ফসলের দামও বৃদ্ধি পাবে। ফলে কৃষকরা অনেক লাভবান হবেন বলে অনেকে মনে করেন। ব্রীজটির পশ্চিম পাড়ে ৩২ নম্বর পোল্ডারে রয়েছে কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়ন এবং পূর্ব পাড়ে ৩৩ নম্বর পোল্ডারে রয়েছে দাকোপ, লাউডোব, কৈলাশগঞ্জ, বাজুয়া ও বানীশান্তা ইউনিয়ন। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) গুরুত্বপূর্ণ ৯টি ব্রীজ নির্মাণ ও প্রোগ্রাম ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রীজেস শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় উপজেলার কালিনগর জিসি—খুটাখালী জিসি রাস্তায় শুন্য চেইনেজে শিংজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে ভদ্রা নদীর উপর পিসি গার্ডার ব্রীজটি নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্ব ব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে নির্মিত এক্সটেশনসহ ব্রীজটির দৈর্ঘ্য ৬৬১ দশমিক ৬৮৫ মিটার এবং প্রস্থ ৭ দশমিক ৩ মিটার। এছাড়া রয়েছে ৮৯৫ মিটার (এইচ বিবি) সংযোগ সড়ক। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ব্রীজটি নির্মানের জন্য দরপত্র আহবান করা হলে পুরানো পল্টন ঢাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান পিটিএসএল মৈত্রী (প্রাঃ) লিমিটেট কাজটি বাস্তবানের দায়িত্ব পায়। কাজটির প্রাক্কলিত মূল্য ছিলো ৩৭ কোটি ৪৩ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫৫ টাকা। ২০১৬ সালের ১৫ আগস্ট ব্রীজটি নির্মান কাজ শুরু হয় এবং ২০১৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী মধ্যে কাজটি শেষ করার কথা। কিন্তু ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত সময় কাজটি শেষ করতে না পারায় কয়েক বার বর্ধিত সময় অনুমোদন করেন এলজিইডি। তারপরও কাজটি শেষ না হওয়ায় ঐ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিল হয়। পুনরায় ব্রীজের অসমাপ্ত কাজের জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরে দরপত্র আহবান করলে বরিশালের নতুন ঠিকাদার মেসার্স কোহিনুর এন্টারপ্রাইজের মেহেদি হাসান চৌধুরী কাজটির দায়িত্ব পায়। কিন্তু নির্ধারিত সময় কাজ শেষ করতে না পারায় ওই প্রতিষ্ঠানেরও কার্যাদেশ বাতিল হয়। পরবর্তীতে পুনরায় আবার ব্রীজটি নির্মানের জন্য দরপত্র আহবান করা হলে নিকাটন গুলশান ঢাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এমবিইএল-এইসি-কেই (জেভি) কাজটি বাস্তবানের দায়িত্ব পায়। কাজটির প্রাক্কলিত মূল্য ছিলো ১৩ কোটি ৩১ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৩ টাকা। মোট ব্রীজটি নির্মানে ব্যয় হয়েছে ৫০ কোটি ৭৫ লাখ ৯ হাজার ২৩৮ টাকা।
দাকোপ ইউপি চেয়ারম্যান বিনয় কৃষ্ণ রায় ও কামারখোলা ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান নুর হোসেন বলেন, উপজেলার ঐতিয্যবাহী কালিনগর বাজার সংলগ্ন ভদ্রা নদীর উপর ব্রীজটি চালু হওয়ায় উপজেলার পোল্ডার সমূহের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের মালামাল পরিবহন সহজতর ও নানাবিধ সুযোগ তৈরি হয়েছে। দ্রুততম পরিবহন ব্যবস্থা সৃষ্টির ফলে এলাকায় আমদানি রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে। ফলে নানামুখি কৃষিজ উৎপাদনের সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে। এলাকার সার্বিক পরিবেশ আধুনিকায়নসহ সেতুটি উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় বহুমাত্রিক সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে।
এমবিইএল-এইসি-কেই (জেভি) ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের পরিচালক জহিরুল ইসলাম খান জানান, মূল গার্ডার ব্রীজের বর্ধিত করণের ও ব্রীজের সংযোগ সড়কের কাজও সর্ম্পূভাবে শেষ হয়েছে। এখন যে কোন সময়ে কর্তৃপক্ষ ব্রীজটির উদ্বোধন করতে পারেন। তবে কালিনগর ব্রীজটি নির্মাণকাজের সময় দুই দফা বন্যা ও নানা প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার এক বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রবল বৃষ্টি ও বন্যার কারণে কাজের সময় সূচি এবং নির্মাণ কার্যক্রম বারবার বাধাগ্রস্থ হয়েছে। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করে কাজটি এগিয়ে নেওয়ার জন্য উপ-সহকারি মিলনের পরামর্শে যথাযথ পরিকল্পনার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
উপজেলা উপ-সহকারি প্রকৌশলী মিলন বলেন, সিনিয়র উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে সার্বক্ষনিক মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নকসা মোতাবেক কোয়ালিটি বজায় রেখে সঠিক সময়ে ব্রীজের কাজটি সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছি।
এবিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর খুলনা (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ কামরুল ইসলাম সরদার জানান, ভদ্রা নদীর উপর নির্মিত ব্রীজটি চালু হওয়ায় কয়রা, পাইকগাছা, মোংলা এবং দাকোপ উপজেলার সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব বিকাশ সাধিত হবে। যা একাধারে কৃষি ও বিপনন ব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নতি ঘটাবে এবং এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন সহজ হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত