জরুরি প্রয়োজন ছাড়াও ভ্রমণ প্রিয় মানুষ কান্তা রায় সুযোগ পেলেই ঢাকার মধ্যে কোথাও ছুটে যেতেন নিজের মতো সময় কাটাতে। কখনো রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা কিংবা কফি-ফাস্টফুড খেতে চলে যেতেন। কিন্তু সপ্তাহখানেক ধরে সব কিছু যেন পাল্টে গেছে তার। মাঝে খুব জরুরি প্রয়োজনে দিনে একবার বের হলেও তীব্র গরমের কারণে ঘর থেকেই সেই অর্থে বের হওয়া হচ্ছে না এই তরুণীর।
রোববার (১৬ এপ্রিল) কান্তা রায় বলেন, ‘গরম-রোদ কখনোই সহ্য হয় না আমার। তাই খুব কম বের হই। আর এই কদিনে তো এত গরম যে বেরই হওয়ার সাহসই করতে পারছি না। গতকাল বাধ্য হয়েই বের হয়েছিলাম।’
শুধু কান্তা রায় একই নন, গত কয়েকদিনের তীব্র দাবদাহের কারণে অতিষ্ঠ নাগরিক জীবন। তাই চাকরিজীবী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী মানুষের বাইরে যাদের খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ আবার ঈদকে কেন্দ্র করে নিজের কিংবা পরিবারের জন্য কেনাকাটা করতে বের হলেও দিনের উত্তাপ কমার পর রাতে মার্কেটে যাচ্ছেন। ফলে দিনের চেয়ে রাতে জমজমাট হয়ে উঠছে রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোর বিপণী বিতানগুলো।
রাজধানীতে একাধিক মার্কেট ও কাপড়-চোপড়, জুতার শো-রুম ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিনের চেয়ে গত কয়েকদিনে রাতে বেশি ভিড় হচ্ছে দোকানে। কোনো কোনো দোকানে রাত ১টার পর পর্যন্ত কেনাকাটা চলছে।
মানুষের এমন দৈনন্দিন অনেক কাজের অভ্যাস পরিবর্তন হয়েছে গরমের প্রভাবে। কারণ বৈশাখের প্রথম দিন থেকে তীব্র দাবদাহে হাঁসফাঁস অবস্থা ছিল রাজধানীবাসীর। গত শুক্রবার দুপুর নাগাদ তাপমাত্রা রেকর্ড ছুঁয়েছিল। গতকাল শনিবারও গরম পড়েছিল রাজধানীতে। আগামী দুই দিন গরম কমার সম্ভাবনা নেই। রাজধানীর রাতের তাপমাত্রা বাড়বে।
এরইমধ্যে ঢাকায় ৫৮ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। ১৯৬৫ সালে ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস উঠলেও এবার ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছে ৪০ দশমিক ৪ ডিগ্রিতে।
দিনে চাপ কম, হাঁটা দায় রাতে
রোববার দুপুরে রাজধানীর পীর ইয়ামেনী মার্কেটে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ দোকানি অনেকটা অলস সময় পার করছেন। কোথাও আবার পাঁচজন কর্মচারির দুজন গ্রাহকদের সামাল দিচ্ছেন বাকিরা গল্প করে সময় কাটাচ্ছেন। তবে বড় বড় কয়েকটি দোকানে বেশ ভিড় দেখা গেছে।
পাঞ্জাবির জন্য পরিচিত এই মার্কেটের তৃতীয় তলায় ‘পুতুল পাঞ্জাবি’র ম্যানেজার মো. রিপন বলেন, ‘আগে এই সময় দম ফেলার সুযোগ পেতাম না। এখন দিনে তো লোকজনের দেখা পাওয়া কঠিন। অনেকে ইফতারের পর বউ-বাচ্চা নিয়ে আসেন। তখন বিক্রি ভালো হয়।’
কী কারণে গ্রাহক কম আসছে বলে মনে করেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গরমে মানুষ ঘরে থাকতে পারছে না। দিনে বের হবে কিভাবে? ছোট বাচ্চাদের জন্য অনেকে গায়ে পরিয়ে জামা নেয়, তাদের পক্ষে দিনে আসা অসম্ভব। রাতে আমরা ফ্যামিলি কাস্টমার বেশি পাচ্ছি। দোকানও মধ্যরাত পর্যন্ত খোলা থাকে।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজমীর সুমী বলেন, ‘ছুটির কারণে কোর্টে যাচ্ছি না। চেম্বারেও যাচ্ছি না। বাসায় দিন কাটাচ্ছি। বাইরে বের হচ্ছি না বললেই চলে। কারণ ঈদের আগে একটা সময় প্রতিদিন কোনো না কোনো কারণে বের হতাম। এবারের চিত্র পুরো ভিন্ন। কারণ একটাই গরম।’
এদিকে বছরের অন্যান্য সময় মার্কেটে রাতে খোলা রাখার সময় নির্ধারণ করা থাকলেও ঈদের আগে এটি অনেকটা উম্মুক্তই থাকে। এবারও একই চিত্র। তবে এবছর রাতে একটু বেশি সময় ধরেই খোলা থাকছে বড় মার্কেটগুলো। বিশেষ করে বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্কের মতো অভিজাত মার্কেট রাত একটা থেকে দুইটা পর্যন্তও খোলা থাকছে।
শুধু তাই নয়, নিউমার্কেট, গাউছিয়া, মৌচাক-মালিবাগ এলাকার মার্কেট, ফুটপাতেও বিক্রি চলে মধ্যরাত অবধি।
শনিবার রাতে বসুন্ধরা সিটিতে কেনাকাটা করার কথা জানিয়ে নুরুল ইসলাম নামের একজন বলেন, ‘গরমের কথা চিন্তা করে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে রাত পৌনে ১১টায় কেনাকাটা করতে বের হয়ে বসুন্ধরায় গিয়ে দেখি লোকে লোকারণ্য। যখন বের হয়েছে তখন মধ্যরাত। তখনও লোকজনের অসম্ভব ভিড় দেখলাম।’
এই মার্কেটের দর্জিবাড়ি শো-রুমের বিক্রয়কর্মী মো. মিলন বলেন, ‘ঈদের কেনাকাটা দিনের চেয়ে রাতে বেশি জমজমাট থাকে। গরম পড়ার পরও আরও বেশি চাপ সামাল দিতে হচ্ছে রাতে। ন্যূনতম একটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত আমাদের বিক্রি চলে।’
এদিকে ঈদের কেনাকাটা জমে ওঠার মুহূর্তে বঙ্গবাজার এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের পর নিউমার্কেটে শনিবারের আগুন লাগার কারণে ঢাকার আশপাশের মার্কেটগুলোতে ক্রেতাদের চাপ বেড়েছে।
পাটুয়াটুলীর বাটা শো রুমের কর্মচারী শহিদুল আলম বলেন, ‘যত সময় কাস্টমার থাকবে ততসময় আউটলেট খোলা থাকবে। রাত ১টার আগে একদিনও বন্ধ করা যাচ্ছে না। গরমের জন্য মানুষ রাতে বেশি আসতেছে।’
খিলগাঁও তালতলা মার্কেটে রাতে মানুষের ভিড়ের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে স্কুল শিক্ষক সামিয়া ইয়াসমীন লিখেছেন, ‘এত রাতেও এত ভিড়। মানুষের জন্য পা ফেলা যাচ্ছে না।’
গরমের তীব্রতা কমবে কবে?
আবহাওয়া অধিদফতর আপাতত গরম কমা নিয়ে খুব একটা সুখবর দিতে পারছে না। তবে সপ্তাহের শেষের দিকে দেশের কিছু অঞ্চলে বৃষ্টি হতে পারে এমন আভাস দিচ্ছে সংস্থাটি।
আবহাওয়াবিদ শাহীনুর ইসলাম বলেন, সামনের দুই দিন সারাদেশে গরম কমার সম্ভাবনা নেই। সহসা পরিস্থিতি উত্তরণের সুখবরও নেই। আজকে ঢাকায় রাতের তাপমাত্রা বাড়বে। দুই দিন পরে সিলেট অঞ্চলে সামান্য বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে।
এমন পরিস্থিতির কারণ নিয়ে আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল জানান, সাগর থেকে যে বাতাসটা আসে সেটা দক্ষিণ পূর্ব মৌসুমী বায়ু। সেটা আসার সময় জলীয় বাষ্প নিয়ে আসে। কিন্তু এবার বাতাসটা আসছে না সেভাবে। আর জলীয় বাষ্পও খুব কম। পশ্চিমা মৌসুমী বায়ু হচ্ছে শুকনো। এটার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় বায়ু যেখানে যেখানে মেশে সেখানে কালবৈশাখীর সৃষ্টি হয়। সেটা হচ্ছে না। কেননা, জলীয় বাষ্প কম। ফলে শুকনো বায়ু প্রবেশ করছে দেশে আর তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত