
ঝড়ো হাওয়া এবং বৃষ্টিপাতে বোরো চাষীরা পুরো ফসল ঘরে তুলতে পারেনি। কেটে রাখা ধান
পানিতে ভিজে এবং ঝড়ের তোড়ে শীষ থেকে ঝরে একটি অংশ জমিতে থেকে যায়। সেখান থেকে কোথাও-
কোথাও চারা গজিয়েছে। ফলন ভালো হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং ধানের বাজার দর কম হওয়ায়
কৃষকগণ লোকসানের মুখে পড়ছেন। অবস্থাপন্নরা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও ক্ষুদ্র জমির মালিক এবং
বর্গা চাষীদের অর্থকষ্ট হাতছানি দিচ্ছে। তাদের অনেকেই ধার-দেনা করে আবাদ করেছিলেন। দেনাদারদের
পাওনা পরিশাধের দুশ্চিন্তায় তারা যন্ত্রনাময় পরিস্থিতি পার করছেন।
জেলার নয় উপজেলাসহ মেট্রো অঞ্চলের দুইটি থানা এলাকায় এবার ৬৫ হাজার ৭শ’ ৭৮ হেক্টর জমিতে
বোরো আবাদ হয়। হেক্টর প্রতি ৪ দশমিক ৭৬ মেট্রিকটন (চালের হিসবে) ফলন হয়েছে। ইতোমধ্যে ৯৪
শতাংশ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে শতাভাগ জমির ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে। ফসল
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়লেও বৃষ্টিতে ভিজে এক শতাংশ জমির ধানের ক্ষতি হয়েছে বলে কৃষি
সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষ দাবি করেছেন।
খুলনায় তিন লাখ ১৭ হাজার ২শ’৭৪ টি কৃষক পরিবার আছে। এরমধ্যে বড় চাষী পরিবারের সংখ্যা মাত্র ৮
হাজার ৩শ’। অন্যদিকে, প্রান্তিক চাষী পরিবার ১ লাখ ৮ হাজার ৫শ’ ৯৪। ক্ষুদ্র জমির মালিক পরিবারের
সংখ্যা ১ লাখ ১৮ হাজার ৫শ’ ৫৬। ভুমিহীন কৃষক পরিবারের সংখ্যা ৪২ হাজার ৮শ’ এবং মাঝারি কৃষক
পরিবার ৩৮ হাজার ৭শ’ ৮১। সংখ্যা গরিষ্ট এসব কৃষকরাই মূলত বর্গাচাষী। যারা অপরের জমিতে ফসলের
ভাগের চুক্তিতে চাষাবাদ করেন। চাষাবাদকালে তারা অনেকেই সার-বীজ, কীটনাশকের দোকান থেকে
বাকীতে পণ্য নিয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে ২৮ টাকার ইউরিয়া সার ৩০ থেকে ৩২ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
কোম্পানিগুলোর কমিশন জনিত কারসাজিতে অসাধু দোকানদাররা কীটনাশকও ইচ্ছেমত দামে বিক্রি
করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন স্থানের কয়েকজন কৃষক ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে
এসব তথ্য জানা গেছে।
রূপসা উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের যুগিহাটী গ্রামের কৃষক জাহান শেখ (৪২) পুটিমারী বিলে
এক বিঘে ১৫ কাঠা জমিতে বোরো আবাদ করেন। এ জন্য তাকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিতে হয়েছে।
পাঁচ কাঠা জমি তার নিজের, বাকী জমিতে তিনি বর্গা চাষ করেছেন। জমির মালিককে এক ভাগ, সেচ
যন্ত্রের মালিককে এক ভাগ ও বাকী অর্ধেক ফসল তার। তিন কাঠা জমির ধান কাটার পর সেদিন বৃষ্টি
নেমেছিল। ওই জমির ধানের প্রায় সবই জমিতে পড়ে চারা গজিয়েছে। মনে হচ্ছে ছিটানো ধানের চারা
গজিয়েছে। যেগুলোর আকার চার/পাঁচ ইঞ্চি। খড় সব পঁচে গেছে। বাকী জমির ধানও ঝড়-বৃষ্টিতে
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরেজমিন পরিদর্শণকালে ভুক্তভোগী এসব কথা জানান।
তিনি বলেন, ধানের ফলন্ত অবস্থায় দুই বার সেচ যন্ত্র চুরি হয়। সেচ যন্ত্রের মালিক প্রয়োজনমত পানি
সরবরাহ করতে ব্যর্থ হন। এতে তার ১৪ বিঘা জমির ফলনে বিরুপ প্রভাব পড়ে। তিনি অন্যদের ভাগ দিয়ে মাত্র
৮ মন ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন। ধান ভিজে মান নষ্ট হওয়ার কারণে এক ফড়িয়া গত রাতে ৮শ’ টাকা মন দরে
ধান কিনেছেন। বিক্রির পর তিনি ১২ ঘন্টায় ১শ’ টাকা ভাড়ায় আনা মেশিনে ধান মাড়াই করছিলেন।
জাহান জানান, সার ও কীটনাশকের দোকানে বকেয়া আছে প্রায় চার হাজার টাকা। স্থানীয় একজন
পাবেন ১০ হাজার টাকা। তাদের দেনা পরিশোধের জন্য তাকে দাম কম পেলেও সব ধান বিক্রি করে দিতে
হচ্ছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে তার কাছে আর ধান থাকবে না। এতেও সব দেনা শোধ হবেনা।
লোকসানে তিনি মুষড়ে পড়েছেন। আগামীতে আমন চাষ তিনি কীভাবে করবেন? এ দুশ্চিন্তাও তাকে
ভাবিয়ে তুলেছে। ওই এলাকার বেশিরভাগ বর্গা চাষীর দুর্দশার চিত্র প্রায় একই রকম। শনিবার দুপুরে প্রখর
রোদ ও গরমের তীব্রতার মধ্যে বিভিন্ন স্থানের কৃষকদের মেশিন দিয়ে ধান মাড়াই করতে, ভ্যানে ও মাথায়
করে ধান বহন করতে এবং ধান কাটতে দেখা গেছে। কোথাও-কোথাও ভেজা ধান শুকানোর জন্য জড়ো করে
রাখা হয়েছে।
জেলার কয়েকটি উপেজেলার বিভিন্ন প্রান্তের কয়েকজন কৃষক বলেন, ফলন্ত অবস্থায় হওয়া বৃষ্টিপাত উপকারে
লাগলেও পাকা ধানের সময়কার ঝড়- বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে। ভেজার পর শুকানো ধান ফড়িয়ারা কম দামে
কিনছেন। ভালো ধানও কমে কেনার চেষ্টা করছেন। তারা ভেজা ধান (মোটা আকৃতির) ৮শ’ থেকে ৮শ’ ২০
টাকা এবং চিকন জাতের ধান ৯শ’ ২০/৩০ টাকা দরে কিনছিলেন। ঝড় বৃষ্টির কবলে না পড়া ধানের দাম এর
থেকে মনপ্রতি ৩০/৫০ টাকা বেশি দিচ্ছেন। যখন ধানের দাম বাড়বে তখন গরীব কৃষকদের হাতে ধান শেষ
হয়ে যাবে। ফড়িয়া সিন্ডিকেট এবং অবস্থাপন্ন কৃষকরা লাভজনক দামে ধান বেঁচতে পারবেন।
খুলনা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবীদ মোঃ মিজানুর রহমান দৈনিক জন্মভূমিকে বলেন, চলতি
মাসে মোট ৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। গত মাসে বর্ষণের পরিমান ১শ’ ২৮ মিলিমাটার রেকর্ড
হয়েছে। বিভিন্ন সময় ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি এবং কালবৈশাখী ঝড় হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখাকালে
সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বয়ে যাচ্ছিল-মৃদু তাপপ্রবাহ।
খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ নজরুল ইসলাম দৈনিক জন্মভূমিকে বলেন,
সমাগত আমন মৌসুমের জন্য কৃষকদের প্রণোদনা দেয়ার কার্যক্রম আগামী জুন-জুলাই মাস থেকে
শুরু হবে। এতে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত চাষীরা লোকসান পুষিয়ে নিতে পারবেন। তিনি বলেন, অসাধু সার-
বীজ ও কীটনাশক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। গত দুই মাসে ভ্রাম্যমান আদালত
কয়েকজন দোষী ব্যবসায়ীকে সাজা দিয়েছেন।
দৈনিক জন্মভূমি
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত