ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থল ঢাকামুখী মানুষ পরিবহনের জন্য গতকাল শনিবার সরাসরি ১৩টি-সহ মোট ১৯ লঞ্চ বরিশাল ছেড়ে গেছে। বিআইডাব্লিউটিএ'র সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের জরিপ (সার্ভে) অনুযায়ী, এসব লঞ্চের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ২০ হাজার। কিন্তু ওই ১৯টি লঞ্চ প্রায় দুই লাখ যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। বাস্তবতা ও প্রদর্শিত তথ্যের এই গড়মিল যাত্রীদের সাথে প্রতারণা বলে মনে করেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
আর বিআইআইডাব্লিইএ কর্তৃপক্ষ পক্ষ একে বলছে 'সহনীয় মাত্রা'।
বিআইডাব্লিউটিএ এবং লঞ্চের সামনে লাল হরফে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, শনিবার যে ১৯টি নৌযান যাত্রী নিয়ে বরিশাল ছেড়েছে তার মধ্যে সরাসরি চলাচলকারী ১৩টি লঞ্চের মোট ধারণক্ষমতা ১৩ হাজার ৪২৯ জন। এর মধ্যে এমভি সুরভী-৮ লঞ্চের ধারণক্ষমতা ৮৯০ জন, মানামী লঞ্চের ৯১৪, সুন্দরবন-১১ লঞ্চের ১০৯১, পারাবত-১২ লঞ্চের ১৩৫০, প্রিন্স আওলাদ-১০ লঞ্চের ১০১৯, সুরভী-৭ লঞ্চের ৭৪২, অ্যাডভেঞ্জার-১ লঞ্চের ৮৬৩, কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চের ১৫৫০, সুন্দরবন-১০ লঞ্চের ১৩৫০, কুয়াকাটা-২ লঞ্চের ৭০৫, পারাবত-৯ লঞ্চের ৯১০, পারাবত-১০ লঞ্চের ৯২৫ এবং কীর্তনখোলা-২ লঞ্চের ধারণক্ষমতা ১১২০ জন। এছাড়া দিবা সার্ভিসে অ্যাডভেঞ্জার-৬, গ্রীনলাইন-৩ এবং রাজারহাট-সি এবং ভায়া রুটে এমভি মানিক-১, সম্রাট ও রাজহংস-১০ এর সর্বোচ্চ যাত্রী ধারণক্ষমতা রয়েছে আরো প্রায় ৬ হাজার।
বরিশাল নদীবন্দর কর্মকর্তা ও বিআইডাব্লিউটিএ'র যুগ্ম-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, রবিবার সরকারি-বেসরকারি অফিস চালু হওয়ায় শনিবার দিনভর যাত্রী চাপ ছিল বেশি। শুক্রবার বরিশাল নদীবন্দর থেকে দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ লঞ্চে করে ঢাকা গিয়েছেন। একইভাবে চাপ সামলাতে শনিবার লঞ্চ সংখ্যা বাড়ানো হয়। শনিবার ও শুক্রবার প্রতিদিন কমপক্ষে দুই লাখ মানুষ ঢাকার উদ্দেশে লঞ্চে যাত্রা করেন। প্রতিটি লঞ্চই অতিরিক্ত যাত্রী নিয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত লঞ্চের ছাদ থেকে যাত্রীদেরকে নামিয়ে দিয়েছেন। তারপরও যে পরিমাণ অতিরিক্ত যাত্রী ছিল তা সহনীয় পর্যায়ে ছিল বলে তিনি দাবি করেন। অতিরিক্ত যাত্রী বহনের দায়ে শনিবার চারটি লঞ্চকে একলাখ ২৬ হাজার টাকা এবং শুক্রবার তিনটি লঞ্চকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন আদালত। তারপরও অতিরিক্ত যাত্রী বহন করে ঘাট ত্যাগ করেছে লঞ্চগুলো।
লঞ্চে ধারণক্ষমতার যে তথ্য প্রদর্শন করা হয় তা কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে কয়েকগুণ বেশি যাত্রী নিয়ে চলাচল করে। বাস্তবতা ও প্রদর্শিত তথ্যের গড়মিল যাত্রীদের সাথে প্রতারণা বলে মনে করেন সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন বরিশাল জেলার সদস্য সচিব কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু। তিনি বলেন, বিআইডাবিলিউটিএ'র সঙ্গে লঞ্চ মালিকরা সমঝোতা করে এইসব কাজ করে থাকেন। এগুলো নৌযান আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। মালিকপক্ষ লঞ্চের শ্রেণ পরিবর্তন করে ফেলেন। এগুলো সরকারের উচিত কঠোরভাবে মনিটরিং করা।
সরেজমিনে নদীবন্দর ঘুরে দেখা যায়, লঞ্চের ছাদে, কেবিনের আশপাশে এমনকি কার্নিসের ওপর কোনরকমে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে গন্তব্যে পাড়ি জমাচ্ছেন লঞ্চযাত্রীরা। প্রতিটি লঞ্চই ধারণক্ষমতার প্রায় দশগুণ যাত্রীবোঝাই করে বরিশাল নৌবন্দর ত্যাগ করে। নির্ধারিত সময়ের আগে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে লঞ্চগুলো ঘাট ত্যাগ করায় গত দুই দিন শুক্র ও শনিবার পন্টুনে কয়েক হাজার যাত্রী লঞ্চে উঠতে পারেনি। ফলে ফিরতি পথে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে তাদের।
বিআইডাব্লিউটিএ'র নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ১৯টি লঞ্চে সরকারিভাবে ২০ হাজার লোকের ধারণক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবিক দেড়-দুই লাখ মানুষ অর্থাৎ দশগুণ বেশি যাত্রী নিয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাত্রা করেছে। আমাদের আসলে করার কিছুই নেই। মানুষ না যেতে পারলে তাদের ক্ষতি হবে।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, বিআইডাব্লিটিএ কর্তৃপক্ষের নিজস্ব নির্বাহী মেজিস্ট্রেট না থাকায় তারা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে পারেন না। তাই ঈদের আগে বিআইডাব্লিউটিএ ও জেলা প্রশাসন এবং লঞ্চ মালিক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ফিরতি যাত্রায় লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনরোধের জন্য টার্মনাল এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করবেন। কিন্তু ঈদের পর থেকে তাদের কর্মতৎপরতা তেমন একটা দেখা যায়নি। কেবল গত শুক্রবার সন্ধ্যার পরে এসে রাত ৮টার মধ্যে এবং শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টায় ঘাটে এসে অবস্থান নিয়ে সন্ধ্যা পৌনে ৭টা থেকে ৭টার মধ্যে লঞ্চগুলো ঘাট ত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন আদালত। গতকালও নিয়মিত, ভায়ারুট, দিবা সার্ভিস, সরকারি নৌযান মিলে মোট ২১টি যাত্রীবাহী লঞ্চ বরিশাল ছেড়ে গেছে।
এ বিষয়ে সরকারি মুঠোফোন নম্বরে শুক্রবার ও শনিবার একাধিকবার কল করা হলেও জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দিন হায়দার তা রিসিভ করেননি। তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) প্রশান্ত কুমার দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ঈদ ও কোরবানির ছুটিতে যাত্রীদের অনুপাতে লঞ্চের সংখ্যা খুবই কম। ফলে যাত্রী সামাল দেওয়া অনেকটা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিদিনই নির্বাহী মেজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত গিয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই লঞ্চগুলো ঘাট ত্যাগ করতে বাধ্য করেন। শুক্রবার ও শনিবার ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ওঠানোর দায়ের ৭টি লঞ্চে একলাখ ৫৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
পিএসএন/এমঅাই
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত