মানুষ আত্মহত্যা করছেন। তাও এখন আর চুপিসারে নয়। ফেসবুক লাইভে এসে সবাইকে জানিয়ে আত্মহননের পথে যাচ্ছেন অনেকে। সর্বশেষ গত বুধবার রাতে ফেসবুক লাইভে এসে চিত্রনায়ক রিয়াজের শ্বশুর আবু মহসিন খানের আত্মহত্যার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে সমাজবিজ্ঞানীদের।
বিজ্ঞাপন
ক্যারিয়ার আর অর্থের পেছনে ছুটছে মানুষ। এর ফলে গত কয়েক যুগে গতানুগতিক যৌথ পরিবার ভেঙে জন্ম হচ্ছে একক পরিবারের। এসব পরিবারের প্রবীণরা ভুগছেন একাকিত্বে। কখনো পরিস্থিতির শিকার হয়ে, আবার কখনো পরিবারের অন্য সদস্যদের অবহেলায়।
পুলিশ বলছে, দীর্ঘদিনের একাকী জীবন, ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই, ব্যবসায় লোকসান—সব কিছু মিলিয়ে চরম অবসাদগ্রস্ত হয়ে আবু মহসিন খান আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন।
শুধু তিনি নন, ২০২১ সালের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ছয় মাসে আরো তিনজন ফেসবুক লাইভে এসে আত্মহত্যা করেছেন।
গত বছরের ১৭ আগস্ট মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কামালপুর ইউনিয়নের গয়ঘর এলাকায় সুমন নামের এক যুবক ফেসবুক লাইভে এসে আত্মহত্যা করেন। তাঁর এ মৃত্যুর জন্য তিনি কাউকে দায়ী করেননি।
গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর গাজীপুরে ফেসবুক লাইভে এসে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেন পুবাইলের স্বপন চন্দ্র দাস নামের এক ব্যবসায়ী। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর সবুজ সরকার নামে কুমিল্লার এক তরুণ সৌদি আরবে ফেসবুক লাইভে এসে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
এর বাইরেও প্রবীণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এঁদের বেশির ভাগই একা থাকেন অথবা পরিবারের অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হন। গত বছরের ৩ জানুয়ারি রাজধানীর লালবাগের নিউ পল্টন এলাকার নিজ বাড়ি থেকে জুলহাস মুন্সি (৭০) নামের এক বৃদ্ধের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, জুলহাস ওই বাসায় একাই থাকতেন। নিঃসঙ্গ অবস্থায় খালি ঘরে তিনি আত্মহত্যা করেন।
একই বছরের ৩০ ডিসেম্বর বরগুনার পাথরঘাটায় পারিবারিক কলহে অভিমান করে মো. জয়নাল মাঝি (৫৫) নামের এক বৃদ্ধ আত্মহত্যা করেন। ১৬ নভেম্বর রাজধানী বাড্ডার সাঁতারকূল রোডে আব্দুল বারেক হাওলাদার (৬৩) নামের এক বৃদ্ধ আত্মহত্যা করেন।
এর আগে ১২ অক্টোবর কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন ইদ্রিস আলী (৭৫)। ১৭ সেপ্টেম্বর নাটোরের লালপুরে জলিল খামারু বিষ পানে আত্মহত্যা করেন। ৭ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জের মাধবপুরে আবদুল জাহের মিয়া (৬৫) গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, আবু মহসিনের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই ঘটনা সবার চোখ খুলে দিয়েছে। তবে একাকী থাকার ফলে কয়েক বছর ধরেই প্রবীণদের মধ্যে আত্মহননের ঘটনা ঘটেছে। এত দিন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা না হলেও আবু মহসিনের আত্মহত্যার পর তা সামনে এসেছে। এ অবস্থায় পরিবার, রাষ্ট্র-সমাজ প্রবীণদের দায়িত্ব না নিলে এমন ঘটনা বা বিপদ আরো বাড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক খন্দকার ফারজানা রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য একেবারেই অবহেলিত। এর মূল কারণ হলো সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। বিশ্বায়নের এই যুগে প্রবীণরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার দায় রয়েছে। তাদের প্রতি আমাদের আরো বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। ’
পি এস/এন আই
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত