
মোবাইল আনলক করতে বা বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে লগইন করতে ফেস স্ক্যান ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে খুবই সুবিধাজনক। কিন্তু ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে যদি আপনার উদ্বেগ থাকে, তাহলে এটি সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি নয়; বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরীকদের জন্য। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর একটি আইনি ফাঁকফোকরের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বায়োমেট্রিক তথ্য—যেমন ফেস আইডি বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট—ব্যবহার করে ডিভাইস আনলক করতে বাধ্য করতে পারে। তবে তারা পাসওয়ার্ড বা পিন জানাতে বাধ্য করতে পারে না।
বিষয়টি আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের আইনেই সীমাবদ্ধ। তবে সময়ের সাথে অন্য যেকোনও দেশেও হতে পারে এই ধরনের আইন। সেক্ষেত্রে আগেভাগে সচেতন থাকাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
মার্কিন আদালতের নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর এক প্রতিবেদকের বাসায় এফবিআই অভিযান চালায়। ৪০৪ মিডিয়ার প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবেদকের আইফোন ‘লকডাউন মোডে’ থাকায় সেটি আনলক করা সম্ভব হয়নি। পরে ফেডারেল বিচারকের কাছ থেকে পরোয়ানা নিয়ে তাকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানের মাধ্যমে কম্পিউটার আনলক করতে বাধ্য করা হয়।
বায়োমেট্রিক আনলক কতটা নিরাপদ?
বায়োমেট্রিক ডেটা বলতে মূলত মুখের স্ক্যান বা আঙুলের ছাপ বোঝায়, যা আপনার ফোন, ট্যাবলেট বা কম্পিউটার আপনার পরিচয় যাচাই করতে ব্যবহার করে। এসব তথ্য দিয়ে শুধু ডিভাইস আনলকই নয়, পাসকি ব্যবহার করে সংবেদনশীল অনলাইন অ্যাকাউন্টেও প্রবেশ করা যায়।
পাসকি হলো এমন একটি লগইন পদ্ধতি, যেখানে পাসওয়ার্ড ছাড়াই ডিভাইসের মাধ্যমে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা যায়— যা বায়োমেট্রিক বা পাসকোড দিয়ে সুরক্ষিত থাকে। অনেক ওয়েবসাইট এখন লগইন প্রক্রিয়া সহজ করতে এই সুবিধা দিচ্ছে।
সবার ঝুঁকি এক নয়
সব ব্যবহারকারীর জন্য একই মাত্রার নিরাপত্তা প্রয়োজন হয় না। তবে যারা সরকার বা অপরাধী চক্রের নজরদারির ঝুঁকিতে থাকেন— যেমন সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, অভিবাসী বা রাজনীতিক; তাদের জন্য পাসকোড বা দীর্ঘ পাসফ্রেজ ব্যবহার করা বেশি নিরাপদ। কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আপনাকে জোর করে পাসকোড টাইপ করাতে পারে না।
এছাড়া অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস উভয় প্ল্যাটফর্মেই এমন সেটিংস রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতিতে ফোনের সব ডেটা মুছে ফেলা যায়।
লকডাউন মোড কী করে?
অ্যাপল ডিভাইসে রয়েছে ‘লকডাউন মোড’, যা মেসেজে অ্যাটাচমেন্ট ব্লক করা, ডিভাইস ম্যানেজমেন্ট ইনস্টলেশন বন্ধ রাখা এবং ব্রাউজিং সীমিত করার মতো কঠোর সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করে। সেটিংসের প্রাইভেসি অ্যান্ড সিকিউরিটি মেনুতে গিয়ে এই ফিচার চালু করা যায়।
অন্যদিকে গুগল-এর অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসেও ‘লকডাউন’ অপশন রয়েছে, যা সাময়িকভাবে বায়োমেট্রিক আনলক নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এতে কেউ জোর করে আপনার মুখ বা আঙুল ব্যবহার করে ফোন আনলক করতে পারবে না।
এছাড়া গুগলের ‘অ্যাডভান্সড প্রোটেকশন’ মোড হার্ডওয়্যার সিকিউরিটি কী বা পাসকি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে এবং ক্ষতিকর অ্যাপ বা ফাইল ডাউনলোড প্রতিরোধ করে।
কী করবেন?
আপনি যদি বায়োমেট্রিকের বদলে পাসকোড ব্যবহার করতে চান, তাহলে আগে ডিভাইস থেকে সংরক্ষিত ফেস বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডেটা মুছে ফেলুন। ভালো খবর হলো—এই তথ্য ক্লাউডে নয়, ডিভাইসেই সংরক্ষিত থাকে। মুছে ফেললে তা স্থায়ীভাবেই মুছে যায়।
অ্যান্ড্রয়েডে: সেটিংস → সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রাইভেসি → ডিভাইস আনলক/বায়োমেট্রিকস থেকে বায়োমেট্রিক ডেটা ডিলিট করুন।
আইওএসে: সেটিংস →ফেইস আইডি/টাচ আইডি আন্ড পাসকোড থেকে রিসেট ফেইস আইডি বা ডিলিট ফিঙ্গারপ্রিন্ট নির্বাচন করুন।
এই ঘটনা দেখিয়েছে, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার প্রশ্নে সচেতনতা জরুরি। আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, “আমার লুকানোর কিছু নেই।” কিন্তু ব্যক্তিগত গোপনীয়তা শুধু অপরাধ আড়াল করার বিষয় নয়—এটি নাগরিক অধিকার।
নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার আগে প্রাইভেসি নীতিমালা পড়া, পুরোনো অপ্রয়োজনীয় অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা এবং প্রতিটি অ্যাকাউন্টে শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা—এসব ছোট পদক্ষেপই আপনার ডিজিটাল নিরাপত্তা অনেকটা বাড়িয়ে দিতে পারে।
সূত্র: পিসিম্যাগ
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত