বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট (বিএস)-২ নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করে প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রসকসমসের সাবসিডিয়ারি গ্লাভকসমস। এর আগে আরো বেশ কয়েকটি দেশ স্যাটেলাইটটি নির্মাণে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে। তবে দুবার মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়া গ্লাভকসমসের মাধ্যমে বিএস-২ নির্মাণ হলে স্যাটেলাইটটির সেবা বিপণনে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল) সূত্রে জানা গেছে, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না গ্রেটওয়াল ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশন, ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস ও এয়ারবাস স্যাটেলাইট নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বিএস-১ নির্মাণ ও উেক্ষপণ করেছে। জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিসাইল স্যাংসন ল’-এর আওতায় মিসাইল টেকনোলজি কন্ট্রোল রেজিম (এমটিসিআর) নীতিমালার সঙ্গে কার্যক্রম অসংগতিপূর্ণ হওয়ায় ১৯৯২ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এক নির্বাহী আদেশে গ্লাভকসমসের ওপর প্রথমবার নিষেধাজ্ঞা দেয়। এ নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হয় ১৯৯৪ সালে। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৮ সালের জুলাইয়ে আবারো প্রতিষ্ঠানটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। কোম্পানির কর্মকর্তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি এবং নিষেধাজ্ঞা থাকা অবস্থায় কোনো দেশ চুক্তি করলে সে দেশের সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞার শর্ত প্রযোজ্য হবে এমন অনুচ্ছেদ আদেশে উল্লেখ করা হয়। ২০১০ সালে এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়। ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো রাশিয়ার গ্লাভকসমসের সঙ্গে একটি জিওসিঙ্ক্রোনাস স্যাটেলাইট (জিএসএলভি) প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০১৪ সালে এ প্রকল্প নিয়ে বিপত্তিতে পড়তে হয় ইসরোকে। পরে ভারত নিজস্ব ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন ব্যবহারের মাধ্যমে এ থেকে বেরিয়ে আসে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বঙ্গবন্ধু-২ স্যাটেলাইটটিতে থাকছে অপটিক্যাল ভিএইচআর-সার (সিনথেটিক অ্যাপারচার রাডার)। এটির মূল কাজ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ভূমি ও সমুদ্র এলাকার ছবি তোলা। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস থাকায় রাশিয়ার তৈরি স্যাটেলাইট দিয়ে ছবি তোলার ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া মার্কিন কাউন্টারিং অ্যামেরিকা’স অ্যাডভারসারিজ থ্রু স্যাংশনস অ্যাক্ট (কাটসা) সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণেও রাশিয়ার তৈরি স্যাটেলাইট থেকে ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলো নিজেদের ভূখণ্ড ও সমুদ্রসীমার ছবি তুলতে না দেয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ এ বিষয়ে বলেন, গ্লাভকসমসের কাছ থেকে একটি সমঝোতা স্মারকের প্রস্তাব পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির ওপর যদি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মতো কোনো ঘটনা থাকে, তাহলে সেটা অবশ্যই বিবেচনার বিষয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই। বিষয়টি যাচাই করে দেখা হবে। ইও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অত্যন্ত উচ্চ মানসম্পন্ন/ভেরি হাই রেজল্যুশন (ভিএইচআর) চিত্র পাওয়া সম্ভব। এছাড়া এর সিনথেটিক-অ্যাপারচার রাডারের (এসএআর) মাধ্যমে দ্বিমাত্রিক ছবি পাওয়া যায়। এসব ছবি স্থানিক পরিবেশ বিশ্লেষণে ব্যবহার করা হয়। অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় জলজ সম্পদ ও পরিবেশ, যেমন সমুদ্র এবং নদীর স্তর, তরঙ্গ গতির বিশ্লেষণ, জাহাজ শনাক্তকরণ, জলের গুণমান নিরীক্ষায় ইও স্যাটেলাইট ব্যবহার হয়। এছাড়া বন্যা পর্যবেক্ষণ, বন রক্ষা কর্মসূচি, ভূমিপৃষ্ঠ গতি ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, শহুরে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ-পরিবর্তন, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাসহ আরো বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এসব স্যাটেলাইট কাজ করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২১ সালের শেষাংশে বিএস-২ নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হবে। ২০২২ সালের শুরুতে এ প্রক্রিয়া শেষ হতে পারে। ২০২৪ সালে এটির সিস্টেম ক্রিটিক্যাল ডিজাইন নিয়ে পর্যালোচনা হতে পারে। একই বছর তৃতীয় প্রান্তিকে এ স্যাটেলাইট প্রথম উেক্ষপিত হতে পারে। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে হতে পারে এর দ্বিতীয় উেক্ষপণ। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ১২ মে বিএস-১ মহাকাশে উেক্ষপণের মাধ্যমে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে স্যাটেলাইট উেক্ষপণকারী দেশগুলোর তালিকায় অবস্থান করে নেয় বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে বিএস-১ উেক্ষপণ করা হয়। স্যাটেলাইট উেক্ষপণে প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হয় ফ্যালকন ৯ রকেটের সর্বশেষ সংস্করণ ব্লক ৫। ৩ হাজার ৫০০ কেজি ওজনের এ স্যাটেলাইটে রয়েছে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার, যার ২৬টি কেইউ ব্যান্ডের ও ১৪টি সি ব্যান্ডের। ট্রান্সপন্ডারের ২০টি নিজস্ব ব্যবহারের জন্য ও বাকিগুলো রাখা হয়েছে বাণিজ্যিকভিত্তিতে ভাড়া দেয়ার জন্য। বিএস-১ নির্মাণ করেছে ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস। এটির নির্মাণ ও উেক্ষপণে ব্যয় হয় ২ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। যোগাযোগ ও সম্প্রচার কার্যক্রমেই মূলত ব্যবহার হচ্ছে এ স্যাটেলাইট। বিএস-১ থেকে বছরে আয় হচ্ছে ১২০ কোটি টাকা। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সম্প্রচারের জন্য এ অর্থ দিচ্ছে। স্যাটেলাইটটির ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করে দেশের দুর্গম দ্বীপ, নদী ও হাওর এবং পাহাড়ি অঞ্চলে টেলিযোগাযোগ সেবা দেয়া হচ্ছে।
পিএসএন/এমঅাই
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত