পাল্টে গেছে শরণখোলার দৃশ্যপট
আসাদুজ্জামান মিলন, শরণখোলা থেকে
শরণখোলায় মোট আবাদী জমির পরিমান ১০ হাজার হেক্টর। এ জমিতে বছরে মাত্র একবার রোপা আমনের চাষ হত। আমন মৌসুমের ফসল তুলে নেয়ার পর সামান্য কিছু জমিতে খেসারী ডালের (কলাই) চাষ হলেও বছরের অধিকাংশ সময় বিস্তীর্ন এ জমি পতিত ও চাষিদের কর্মচ ল হাত গুলো বেকার পড়ে থাকতো। কিন্তু এবারে পাল্টে গেছে দৃষ্যপট। পতিত সেই জমিতে এখন সবুজের সমারোহ । তর তর করে বেড়ে ওঠা ইরি বোরো ধান ক্ষেতে এখন মৌ মৌ গন্ধ। চাষীদের চোখে বাম্পার ফলনের স্বপ্ন, আর মুখে হাসির ঝিলিক ।
উপজেলা কৃষি বিভাগ ও বিভিন্ন গ্রামের চাষীদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, ৮০ দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ নির্মান আর অধিকাংশ খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানির অভাবে এ উপজেলার মানুষ ক্রমেই এক ফসলের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বছরে মাত্র একবার আমন ধান ফলিয়ে চাষীরা সারা বছর হাত গুটিয়ে বসে থাকত। কিছু চাষী আমন ধানের পর সামান্য কিছু জমিতে খেসারী ডালের বীজ ফেলে রাখতো। এছাড়া হাজার হাজার একর জমি বছরের পর বছর পতিত পড়ে থাকতো । কিন্তু ২০০৭ সালের সুপার সাইক্লোন সিডরের পর সরকার, বিভিন্ন দাতা গোষ্ঠী ও উন্নয়ন সংস্থার পরিচর্যায় এ উপজেলার কৃষি ব্যবস্থা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে।
উপজেলা কৃষি বিভাগের উদ্যোগ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা গুলোর সহায়তা ও সরকারের নানা প্রনোদনা শরণখোলার কৃষি ব্যবস্থাপনা ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে ।
অতি দরিদ্রদের জন্য ৪০ দিনের কর্মসূচী, মৎস্য অধিদপ্তরের স্বাদু পানির মাছ সংরক্ষনের জন্য খাল খনন কর্মসূচী ও বিশ^ ব্যাংকের নির্মানাধীন বেড়িবাঁধ প্রকল্পের মাধ্যমে কয়েকটি খাল খননের কারনে পানির অভাব কিছুটা হলে ও লাঘব হয়। যার ফলে চাষীরা সত্যি সত্যি হালে পানি পায় । নতুন চাষের এ আহবানে তারা উদ্যোগী হয়ে ওঠে ।
উপজেলার খাদা গ্রামের চাষী হারেজ আকন জানান, গত কয়েক বছর ধরে কৃষি বিভাগের সহায়তায় তাদের গ্রামের কয়েকজন মিলে ৪০/৫০ বিঘা জমিতে তারা নিজেদের মতো বোরো চাষ করে আসছেন। কিন্তু দুই বছর আগে রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদ লজিক প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের জমিতে সেচ মেশিন স্থাপন ও দীর্ঘ ড্রেন নির্মান করে দেয়ায় গত বছর চাষীরা সুফল পায় । তাই এবছর তাদের মাঠে গত বছরের তুলনায় ১০ গুন বেশী জমিতে বোরো চাষ হয়েছে । পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারলে আগামীতে এ উপজেলার কোন জমি পতিত থাকবেনা বলে জানান তিনি।
উপজেলার মঠেরপাড় গ্রামের চাষী মোশারেফ তালুকদার জানায় , আমন চাষের পর তার জমি সারা বছর শুন্য পড়ে থাকতো । এবার উপজেলা কৃষি বিভাগের তাগিদ আর পাশ^বর্তী চাষীদের উৎসাহে সে দুই বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছেন। জমি চাষ, বীজ, সার, কীটনাশক ও সেচ বাবদ তার প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে প্রতি বিঘা জমিতে ৪০ মনের মত ধান হবে বলে তার আশা। প্রতিমন ধান ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও প্রতি বিঘা জমির ধান বিক্রি হবে ৩২০০০ টাকা । তার মতে যারা এবার বোরো চাষ করেছে তারা ঠিক মত ফসল ঘরে তুলতে পারলে প্রতি বিঘা জমিতে কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা লাভবান হবেন তারা। তার প্রতিবেশী রহিম হাওলাদার ৫ বিঘা, ইব্রাহিম মিয়া ২ বিঘা জমিতে বোরো চাষ করে অনুরুপ লাভবান হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
এ একই রকম অবস্থা উপজেলার ধানসাগর ইউনিয়নের বাওড় ও হোগলপাতি, রায়েন্দা ইউনিয়নের লাকুড়তলা, মালিয়া ও উত্তর রাজাপুর, সাউথখালী ইউনিয়নের বগী, চালিতাবুনিয়া ও বকুলতলা ও খোন্তাকাটা ইউনিয়নের খোন্তাকাটা, রাজৈর, মঠের পাড় ও দক্ষিন আমড়াগাছিয়া গামের।
এবার উপজেলার সব গ্রামেই কমবেশী বোরো চাষ হলেও যেসব এলাকায় পানির উৎস আছে সেখানেই ব্যাপক বোরো চাষ হয়েছে । তাই আগামীর উন্নয়ন পরিকল্পনায় শরণখোলার ভরাট হয়ে যাওয়া খাল খনন ও সেচযন্ত্র স্থাপনের প্রকল্প গ্রহনের দাবী সংশ্ষ্টি চাষীদের। ধানসাগর কালিবাড়ি গ্রামের সফল চাষী ইউসুপ, সাউথখালী সিএসবি এলাকার দুলাল ও উত্তর রাজাপুর গ্রামের মাসুদ মীর আশা প্রকাশ করে বলেন, এবার তাদের জমিতে বাম্পার ফলন পাবেন। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আর চাষীদের কে আরো অনুপ্রাণীত করতে পারলে আগামীতে শরণখোলার কোন জমি পতিত থাকবেনা। এক ফসলে উপর নির্ভরশীল এ উপজেলার মাঠ সারা বছর ফসলে ফসলে ভরে থাকবে। শরণখোলা হয়ে উঠবে অপার সম্ভাবনাময় উপজেলা ।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ওয়াসিম উদ্দিন চাষীদের এসব দাবীর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বলেন, এ উপজেলার উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। খালগুলো খনন ও সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আগামীতে এ উপজেলায় বোরো চাষ কয়েকগুন বেড়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, গত মৌসুমে এ উপজেলায় ১২০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছিলো। কিন্তু এবার চাষ হযেছে তার ৪ গুন অর্থাৎ ৪৫০ হেক্টর জমিতে । আগামীতে এ চাষ ১০ গুন সম্প্রসারিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। কৃষি বিভাগ এবার শরণখোলায় ৩০০ জন চাষীকে বাংলাদেশ পরমানু কৃষি গবেষনা ইনিষ্টিটিউটের লবন সহনশীল বীনা ১০ ও বাংলাদেশ ধান গবেষনা ইনিষ্টিটিউটের মাধ্যমে ৬০ জন চাষীকে বিনামূল্যে বীজ সরবারহ করেছেন উল্লেখ করে বলেন , কৃষি বিভাগের কর্মীরা সার্বক্ষনিক মাঠে থেকে চাষীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন । ভোলা নদীর লবন পানি ঠেকাতে প্রশাসনের সহায়তায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৬টি ¯øুইজ গেট তালা লাগিয়ে আটকে রাখা হযেছে ।
বাগেরহাট ৪ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য এ্যাডভোকেট আমিরুল আলম মিলন বলেন, চাষীদের উৎসাহ দিতে আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা করবো। ইতোমধ্যে শরণখোলা মোরেলগঞ্জের অনেক গুলো খাল খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে । পানি উন্নয়ন বোর্ড শীঘ্রই খাল খননের কাজ শুরু করবে। এ ছাড়া কৃষি বান্ধব এ সরকারের পক্ষ থেকে চাষীদের সব ধরনের সহায়তা দেয়া হচ্ছে । ভবিষ্যতে ও কৃষিখাতে প্রনোদনা সহ সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত