
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার বয়ারভাঙ্গা প্রযুক্তি গ্রামে বোরো মৌসুমের ‘ব্রি হাইব্রিড ধান ৮’ জাতের ওপর বায়োকোটেড ইউরিয়ার প্রভাব মূল্যায়ন বিষয়ক ‘ফসল কর্তন ও মাঠ দিবস’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ ৩০ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) এলএসটিডি প্রকল্পের অর্থায়নে এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এর মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ ও খুলনা স্যাটেলাইট স্টেশনের যৌথ আয়োজনে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। এ বছর পরীক্ষামূলকভাবে বয়ারভাঙ্গা প্রযুক্তিগ্রামের ১০০ বিঘা জমিতে এই নতুন ‘বায়োকোটেড ইউরিয়া’ প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। মাঠ দিবসের ফসল কর্তন শেষে দেখা যায়, সাধারণ পদ্ধতির চেয়ে এই প্রযুক্তিতে ধানের ফলন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বায়োকোটেড ইউরিয়ার উদ্ভাবক ও ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয় গোপালগঞ্জের চিফ সাইন্টিফিক অফিসার (সিএসও) ড. উম্মে আমিনুন নাহার। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ‘শুধু উন্নত জাত লাগালেই ফলন ভালো হবে না, যদি না সার ও কীটনাশকের সঠিক সমন্বয় করা হয়। আমি ইউরিয়া সারের সাথে কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া কোট করে দিয়েছি যা বাতাস থেকে ৪০ শতাংশ নাইট্রোজেন গ্রহণ করতে পারে। এতে ইউরিয়া সারের ওপর নির্ভরতা কমবে। কৃষকরা লাভবান হলে আগামীতে এই পদ্ধতি আরও বড় পরিসরে প্রয়োগ করা হবে’। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বটিয়াঘাটা উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘এই পদ্ধতিতে ইউরিয়া দিলে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমবে। পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তি কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে যেমন স্বাবলম্বী করবে, তেমনি মাটির উর্বরতা রক্ষায়ও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। আমরা চাই বটিয়াঘাটার প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে এই সাশ্রয়ী প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ুক’। ব্রি গোপালগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (এসএসও) ড. মোঃ হুমায়ুন কবির বক্তিয়ার এই প্রযুক্তিকে একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন হিসেবে উল্লেখ করেন। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে তিনি একটি বিশেষ প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনা করেন, যেখানে কৃষকদের বিভিন্ন কারিগরি সমস্যা ও চাষাবাদ পদ্ধতি নিয়ে সরাসরি সমাধান ও পরামর্শ প্রদান করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন এলএসটিডি প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া সারের ক্রমবর্ধমান মূল্যের প্রেক্ষাপটে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে যদি ৩০ শতাংশ সার সাশ্রয় করা সম্ভব হয়, তবে জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সাশ্রয় হবে”। মাঠ দিবসে নিজেদের সফলতার কথা জানান স্থানীয় কৃষকরা। বয়ারভাঙ্গা প্রযুক্তিগ্রামের কৃষক সুবির বিশ্বাস বলেন, "আগে আমি যুবরাজ বা বেবিলনের মতো স্থানীয় জাতের ধান চাষ করতাম। কিন্তু এবার এই প্রজেক্টের সহযোগিতায় ২ একর জমিতে ব্রি হাইব্রিড ধান ৮ লাগিয়েছি। ধান কাটা শেষে দেখছি ফলন অনেক বেশি হয়েছে। আমি আশা করছি এবার অনেক বেশি লাভবান হতে পারব।" অন্যদিকে দেবীতলা গ্রামের কৃষক আনন্দ মণ্ডল তার অভিজ্ঞতায় বলেন, "আমি বয়ারভাঙ্গা প্রযুক্তিগ্রামের ভেতরেই চাষাবাদ করি। আগে যেসব ধান লাগাতাম, তার চেয়ে এই নতুন জাতটা অনেক বেশি ফলনশীল। এই প্রজেক্ট আমাদের এলাকায় আসার জন্য আমরা কৃষকরা খুবই খুশি। এ বছর প্রায় এক একর জমিতে আমি ব্রি ১০৮ ধান লাগিয়ে বাম্পার ফলন পেয়েছি।" ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন খুলনার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিল্লাল হোসাইনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রায় ১১০ জন কৃষক অংশ নেন। এসময় ব্রি-র বিভিন্ন পর্যায়ের বৈজ্ঞানিক সহকারী ও কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি ‘নতুন ০৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণাগার উন্নয়ন (এলএসটিডি)’ প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত হয়।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত