সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সঙ্গী ২০ দলীয় জোট ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা এসেছে বিএনপির পক্ষ থেকে। চলতি মাসের ৯ তারিখ গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে শরীকদের এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত হয়। সেই সঙ্গে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়- ২০ দলীয় জোটের নাম ব্যবহার করা যাবে না, জোট আর নেই।
তবে ওই বৈঠকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে শরীকরা জোটবদ্ধ হয়ে কিংবা এককভাবে অংশ নিতে পারবেন বলেও সিদ্ধান্ত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০ দলীয় জোটের ১২টি শরীক দল নতুন করে একটি ‘ফ্রন্ট’ গঠন করেছেন। রাত পোহালেই (বৃহস্পতিবার) জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘১২ দলীয় জোট’ নামে আত্মপ্রকাশ হতে যাচ্ছে এই ফ্রন্টের। এছাড়াও ২০ দলীয় জোটের আরও ৬টি দল নিয়ে আত্মপ্রকাশ করবে ‘জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট।’ এই জোট ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির ১০ দফার সমর্থনে এবং সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে আলাদা প্ল্যাটফর্মে রাজধানীতে গণমিছিল করবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বাম-ডান ঘরানার দলগুলো ছাড়াও ইসলামী দলগুলোকে এক কাতারে এনে যুগপৎ আন্দোলন করতে চায় বিএনপি। এই হিসেবে যুগপৎ আন্দোলনে ২০ দলীয় জোটের শরিক দল জামায়াত রাজনৈতিক বিবেচনায় অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাই ২০ দলীয় জোট ভেঙে দেওয়ার কথা শরীকদের জানিয়েছে বিএনপি। আর ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারাও হাসিমুখেই তা মেনে নিয়েছেন।
২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারাও জানিয়েছেন, জোটের প্রধান শরীক যখন চায় না জোট থাকুক, তখন তো আমাদের কিছু বলার থাকে না। মিটিংয়ে বলা হয়েছে- ২০ দলীয় জোটের নাম ব্যবহার করা যাবে না, জোট আর নেই। আমরা যেভাবে পথ চলায় অভ্যস্ত, মনে করি এখনো সেভাবে পথ চললে রাজনীতির জন্য মঙ্গলজনক হবে। তাই জোট না থাকলেও আমরা যুগপৎভাবে একই দাবিতে আন্দোলন করে যাব।
এরই অংশ হিসেবে জোটে থাকা ১২টি রাজনৈতিক দল একটি ফ্রন্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ নিয়ে ইতোমধ্যেই দলগুলোর শীর্ষ নেতারা কয়েক দফায় বৈঠকও করেছেন। এই জোটে যৌথ নেতৃত্বে চলবে এবং একজন সমন্বয়ক থাকবেন।
জোটবদ্ধ হওয়া এই ১২টি দল হলো- মোস্তফা জামাল হায়দারের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জাফর), মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের (বীর প্রতীক) বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের বাংলাদেশ লেবার পার্টি, সৈয়দ এহসানুল হুদার বাংলাদেশ জাতীয় দল, এম আবু তাহেরের এনডিপি, শাহাদাত হোসেন সেলিমের বাংলাদেশ এলডিপি, অ্যাডভোকেট জুলফিকার বুলবুল চৌধুরীর বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, মুফতি মহিউদ্দিন ইকরামের জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, মাওলানা আবদুর রকীবের ইসলামী ঐক্যজোট, কমরেড নুরুল ইসলামের বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল, অ্যাডভোকেট আবুল কাসেমের বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি ও জাগপার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শফিউল আলম প্রধানের মেয়ে ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধানের নেতৃত্বাধীন জাগপা।
এ বিষয়ে জানতে ২০ দলীয় জোটের সমন্বয় ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম (বীর প্রতীক) জানিয়েছেন, আমরা অনেকদিন ধরেই পথ চলেছি, আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল পরিবর্তন, বর্তমান সরকারের পদত্যাগ অথবা বর্তমান সরকারের পরিবর্তে একটি নিরপেক্ষ সরকার।
কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান আরও বলেন, বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে যুগপৎ আন্দোলনের লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনীতি দলের সঙ্গে সংলাপ করেছে। তারা যেহেতু জোটভিত্তিক (বিএনপি) আন্দোলন করতে অনাগ্রহী। সে ক্ষেত্রে দুটিমাত্র পথ খোলা থাকে। এরমধ্যে একটি হলো- প্রত্যেকটি দল নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্দোলন অথবা আমরা যেভাবে পথ চলায় অভ্যস্ত, একে-অপরের প্রতি আস্থা রয়েছে, তারা মিলে কাজ করতে চাই। আর অন্যটি হলো- কল্যাণ পার্টি এবং আমরা সকলে মনে করি ’৭১ সালে যেভাবে আমরা যুদ্ধ করেছিলাম এই রাজনৈতিক আন্দোলনটাও সকলে মিলে করতে চাই। শুধু ১২টি দলই নয়, আমাদের দরজা উন্মুক্ত থাকবে যদি কেউ আসতে আগ্রহী থাকে সেটা আমরা সিদ্ধান্ত নেব কাকে নেওয়া যায়।
নতুন এই ফ্রন্টের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানিয়ে তিনি বলেন, এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকবে আন্দোলনকে বেগবান করা। মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা, সরকারের পরিবর্তন করা, নিরপেক্ষ সরকারের দাবিকে বাস্তবায়ন করা।
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, এখন তো ২০ দল বিভিন্ন কারণে নেই। আমাদের যেহেতু রাজনীতি করতে হবে, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখতে হবে, সেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েছি- জোটের কয়েকটি শরীকদল মিলে কাজ করব। সেই হিসেবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২২ ডিসেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জোটের আত্মপ্রকাশ হবে। এরই ধারাবাহিকতায় ৩০ ডিসেম্বর ১২ দলের পক্ষে বিজয়নগর থেকে গণমিছিল বের হবে।
এদিকে, বিলুপ্ত হওয়া ২০ দলীয় জোটে থাকা আরও ৬টি রাজনৈতিক দল যে ফ্রন্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই দলগুলোর শীর্ষ নেতারা কয়েক দফায় বৈঠক করেছেন। সেসব বৈঠকে জোটের নাম ‘জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট’ রাখতে সম্মত হয়েছেন তারা। যৌথ সমন্বয়ে চলবে এই জোট।
‘জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটে’ থাকা দলগুলো হলো- ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), খন্দকার লুৎফর রহমানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), অ্যাডভোকেট আজহারুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ ভাসানী, সাইফুদ্দিন মনির ডেমোক্রেটিক লীগ, অ্যাডভোকেট মাহবুব হোসেনের পিপলস লীগ এবং শাওন সাদেকীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ন্যাপ।
এ বিষয়ে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ জানিয়েছেন, ২০ দলীয় জোটের যে কাজ ছিল আমাদের নতুন জোট সেই একই কাজ করবে। যেহেতু ২০ দলীয় জোট নেই, তাই জোটগতভাবে আন্দোলন করার জন্যই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ২৮ ডিসেম্বরের মধ্যেই এই জোটের ঘোষণা দেওয়া হবে। সবমিলিয়ে ৯ থেকে ১০টি দল থাকবে এই জোটে।
সার্বিক বিষয়ে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) একাংশের সভাপতি খন্দকার লুৎফর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি চাচ্ছে যুগপৎ আন্দোলন করতে। অনেকে জোটগতভাবে আসছে, আবার অনেকে এককভাবে আসছে। তাই আমরা সকলে চাচ্ছি যার যার অবস্থান থেকে যুগপৎ আন্দোলন করতে। পরবর্তীতে কিছু হলে সবাই ঐক্যবদ্ধ হবে করব এবং সবাইকে মূল্যায়ন করা হবে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ২০ দলীয় জোটে আমরা যে কাজগুলো করেছি, আগামীতে সেই কাজগুলো করার জন্যই নতুন জোট গঠন করছি।
উল্লেখ্য, চার দলীয় জোটের সম্প্রসারণ ঘটিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল ১৮ দল এবং পরে পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকটি দল নিয়ে ২০ দলীয় জোট গঠিত হয়। ডানপন্থী ও মধ্য-ডানপন্থী দলগুলোর সমন্বয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগবিরোধী এই জোট গড়ে উঠেছিল।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত