বৈশ্বিক মন্দা, অভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তা ও সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা বিদেশি ঋণ নেওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণ দাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও বাংলাদেশের অনুকূলে কমিয়ে দিয়েছেন ঋণের প্রবাহ। ফলে বৈদেশিক ঋণ বাবদ ডলার দেশে আসছে কম। এর বিপরীতে আগের ঋণ পরিশোধের অঙ্ক বেড়ে গেছে। ফলে নিট হিসাবে বৈদেশিক অর্থায়ন কমে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ডলার বাজারে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার বাড়ায় ও দফায় দফায় ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বৃদ্ধির ফলে দণ্ড সুদ আরোপ করা হচ্ছে। এতে সার্বিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে বৈদেশিক ঋণের স্থিতি। একই সঙ্গে ডলারের দাম বাড়ায় টাকার অঙ্কে বাড়তি ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। যা দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, জুন পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৮৯৫ কোটি ডলার। ডিসেম্বর পর্যন্ত এর স্থিতি ছিল ৯ হাজার ৬৫০ কোটি ডলার। ৬ মাসে দেশে ঋণের স্থিতি বেড়েছে ২৪৫ কোটি ডলার। গত বছরের জুন পর্যন্ত ঋণের স্থিতি ছিল ৯ হাজার ৫২৩ কোটি ডলার। অথচ আলোচ্য সময়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নতুন ঋণ নেওয়া কমেছে। মূলত আন্তর্জাতিকভাবে ঋণের সুদের হার বাড়ার কারণেই ডলারের অঙ্কে বৈদেশিক ঋণের স্থিতি বেড়েছে। এর সঙ্গে ডলারের দাম বাড়ায় টাকার অঙ্কেও ঋণের স্থিতি বেড়েছে। ডিসেম্বরে ডলারের গড় দাম ছিল ১০৫ টাকা। ওই হিসাবে বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ১০ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। জুন পর্যন্ত টাকার মান স্থিতিশীল থাকলে ঋণের স্থিতি হতো ১০ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ঋণ বাড়ার কথা ২৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ডিসেম্বরের পর থেকে জুন পর্যন্ত ডলারের দাম বেড়ে হয়েছে ১০৮ টাকা ৫০ পয়সা। ওই সময়ে এর দাম বেড়েছে সাড়ে ৩ টাকা। এ হিসাবে ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা। মোট ঋণ বেড়েছে ৫৬ হাজার কোটি টাকা। শুধু টাকার অবমূল্যায়ন ও সুদের হার বাড়ার কারণে ঋণ বেড়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হয়েছিল ১৫৩ কোটি ডলার, গত অর্থবছরে পরিশোধ করা হয়েছে ১৭৫ কোটি ডলার। এক বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ২২ কোটি ডলার। আলোচ্য সময়ে বিভিন্ন খাতে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া কম হয়েছে। আমদানি নিয়ন্ত্রণ করায় বাণিজ্যিক ঋণও কম এসেছে। আগের ঋণ বাড়তি পরিশোধ ও নতুন ঋণ নেওয়া কমার কারণে সার্বিক ঋণ স্থিতি কমার কথা। কিন্তু কমেনি। বরং বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণ করতে আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণের সুদ হার বাড়ানোর কারণে সুদ যোগ হয়ে ডলারের হিসাবে ঋণের স্থিতি বেড়েছে।
করোনার আগে লন্ডন ইন্টার ব্যাংক অফার রেটে (লাইবর) ডলারে ৬ মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় সুদের হার ছিল দেড় থেকে ২ শতাংশ। এর সঙ্গে আড়াই থেকে ৩ শতাংশ যোগ করে ঋণের সুদ নির্ধারিত হতো। এ হিসাবে সুদের হার পড়ত ৪ থেকে ৫ শতাংশ। বর্তমানে লাইবর রেট বেড়ে ডলারে ৫ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং ইউরোতে ৪ দশমিক ৮ শতাংশে উঠেছে। এর সঙ্গে আড়াই শতাংশ যোগ করলে সুদের হার দাঁড়ায় ডলারে ৮ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং ইউরোতে ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। ৩ শতাংশ যোগ করলে সুদের হার আরও বেশি পড়ে। ফলে ঋণের সুদের হার বেড়ে যাচ্ছে। এ কারণে ঋণের স্থিতি বাড়ছে। এছাড়া ঋণ পরিশোধ মেয়াদ দফায় দফায় বাড়ানোর ফলে বাড়তি সুদের পাশাপাশি দণ্ড সুদও দিতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে এর বিপরীতে দণ্ড সুদসহ চড়া সুদ দিতে হয়। এ কারণে বৈশ্বিকভাবে সাধারণত কেউ ঋণ কিস্তি খেলাপি হতে চায় না।
গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের স্থিতি ছিল ৯৮১ কোটি ডলার। জুন পর্যন্ত তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮৬৯ কোটি ডলার। আলোচ্য এক বছরে ঋণের স্থিতি কমেছে ১১২ কোটি ডলার। একই সময়ে এই খাতের ঋণ পরিশোধ ২০১ কোটি ডলার বেড়ে ২৬৭ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে মূলঋণ পরিশোধ বেড়েছে কিছুটা, কিন্তু সুদ পরিশোধ বেড়েছে দ্বিগুণ। ২০২১-২২ অর্থবছরে মূল ঋণ পরিশোধ করা হয়েছিল ১৫৩ কোটি ডলার, গত অর্থবছরে পরিশোধ করা হয়েছে ১৭৪ কোটি ডলার। আলোচ্য সময়ে মূল ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ২১ কোটি ডলার। একই সময়ের ব্যবধানে সুদ পরিশোধ ৪৯ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৯৪ কোটি ডলার হয়েছে। আলোচ্য সময়ে সুদ পরিশোধ বেড়েছে ৪৫ কোটি ডলার।
এর বাইরে অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ২০২১-২২ অর্থবছরে নেওয়া হয়েছিল ১৪৪ কোটি ডলার, গত অর্থবছরে নেওয়া হয়েছে ৫৩ কোটি ডলার। আলোচ্য সময়ে এ খাতের ঋণ কমেছে ৯১ কোটি ডলার। একই খাতের স্বল্পমেয়াদি ঋণ ২০২১-২২ অর্থবছরে নেওয়া হয়েছে ৩৩১ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে এ খাতে কোনো ঋণ নেওয়া হয়নি। উলটো আগের ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে ১৯১ কোটি ডলার।
স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণ ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪৪ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছিল। গত অর্থবছরে পরিশোধ করা হয়েছে ৬৫৩ কোটি ডলার।
এদিকে চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টেও ঋণ প্রবাহ কমেছে। একই সঙ্গে এর বিপরীতে আগের ঋণ পরিশোধের অঙ্ক বেড়ে গেছে। গত বছরের জুলাই-আগস্টে দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদি ঋণ নেওয়া হয়েছে ৮৩ কোটি ডলার, চলতি বছরের একই সময়ে নেওয়া হয়েছে ৭৩ কোটি ডলার। একই সময়ের ব্যবধানে এ ঋণ পরিশোধ বেড়েছে। গত বছরের ওই সময়ে পরিশোধ করা হয়েছিল ২২ কোটি ডলার, চলতি বছরের একই সময়ে পরিশোধ করা হয়েছে ২৯ কোটি ডলার।
অন্যান্য দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদি ঋণ নেওয়াও কমেছে। গত বছরের জুলাই-আগস্টে নেওয়া হয়েছিল ৮ কোটি ডলার, জুলাই-আগস্টে নেওয়া হয়েছে ৪ কোটি ডলার। অন্যান্য স্বল্পমেয়াদি ঋণ গত বছরের জুলাই-আগস্টে নেওয়া হয়েছিল ৭০ কোটি ডলার। চলতি বছরের একই সময়ে নতুন ঋণ নেওয়া হয়নি। বরং আগের ঋণের থেকে ২৬ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছে।
ডলার সংকট মোকাবিলায় ব্যাপকভাবে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। আমদানি কমে যাওয়ায় এর বিপরীতে বাণিজ্যিক ঋণও কমেছে। ফলে এখন নতুন ঋণ কম নিয়ে আগের ঋণ পরিশোধ করা হচ্ছে বেশি। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতে ঋণের স্থিতি কমেছিল ৪৪ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে তা কমেছে ৬৫৩ কোটি ডলার। গত বছরে জুলাই-আগস্টে কমেছিল ১৫৪ কোটি ডলার। চলতি বছরের একই সময়ে কমেছে ১৮১ কোটি ডলার।
প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে নিট বৈদেশিক অর্থায়ন এসেছিল ৮৪৮ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে এসেছে ৭৫২ কোটি ডলার। আলোচ্য সময়ে নিট অর্থায়ন কমেছে ৯৬ কোটি ডলার।
সূত্র জানায়, দেশে রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় বাবদ বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণ থেকেও ডলারের জোগান আসত। নতুন ঋণ গ্রহণ কমে যাওয়ার কারণে ও আগের ঋণ পরিশোধ বৃদ্ধি পাওয়ায় একদিকে দেশে ডলার আসছে কম। অন্যদিকে দেশের বাইরে ডলার চলে যাচ্ছে। এতে করে বাজারে ডলারের সংকট আরও প্রকট হচ্ছে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত