দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার অবনতির পাশাপাশি নির্বাচন নিয়ে দিনেদিনে ভোটারদের আগ্রহ কমে আসছে। পাশাপাশি ভোট দিতে না পারলে কি করবেন- সেটাও জানেন না ভোটাররা। এমন অবস্থায় তাদের কেন্দ্রমুখী করার উদ্যোগের পাশাপাশি ভোটাররা যাতে ভোট নিয়ে নিরাপদে ফিরতে পারেন তা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা।
রোববার (২১ মে) সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত এক অনলাইন বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন।
‘আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন: প্রাসঙ্গিক ভাবনা’ শীর্ষক ওই অনলাইন গোলটেবিল বৈঠকে লিখিত প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজনে’র কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। সুজন সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকের সঞ্চালনায় ছিলেন সংগঠনটির সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।
প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি বলেন, ভোটাররা যাতে প্রার্থীদের সম্পর্কে জেনে-বুঝে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য প্রার্থীদের তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি। কমিশন এই কাজটিকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে কি না- সেটি নিয়ে আমাদের মধ্যে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে এখন নির্বাচন যে অবস্থায় আছে, তাতে এই নির্বাচনগুলো বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যবেক্ষণের দিক থেকে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। এখন নির্বাচনে যত কম দল অংশ নিচ্ছে, যত কম মানুষ ভোট দিচ্ছে তত বেশি ক্ষমতাসীনদের জন্য সুবিধা হচ্ছে। নির্বাচনে প্রতিযোগিতা থাকলে ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এখন নিজেদের মধ্যে ঝুঁকিমুক্ত নির্বাচনের একটি ধারা দাঁড়িয়ে গেছে।
এছাড়া সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার দিনদিন অবনতি হচ্ছে। গত ১০ বছরে দেখা গেছে, নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের আগ্রহ নেই। পার্টির লোকেরাও ভোটকেন্দ্রে যায় না। কারণ তারা ভাবে আমাদের লোকেরাই তো জিতবে। এই অবস্থার কীভাবে সৃষ্টি হলো? নিউট্রাল নির্বাচন হলে কী করে ভোটারকে নিয়ে আসবেন- কেন্দ্রে সেটা নিয়ে ভাবতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের কাজের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রতিষ্ঠা হয়েছে যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে আবার নির্বিঘ্নে বাড়িতে ফিরতে পারেন। এটিই নির্বাচন কমিশনের প্রধান কাজ। এই কাজ না করতে পারলে নির্বাচন কমিশন ফেইল করেছে বলতে হবে।
সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ভোটাররা ভোট দিতে না পারলে কী করবেন তা জানেন না। আজ পর্যন্ত ভোট দিতে না পারার কারণে একটা মামলাও হলো না, যে আমি ভোট দিতে পারিনি। কাজেই ভোট দিতে না পারলে তারা কী করবেন, সেটি ভোটারদের জানাতে হবে। কারণ নির্বাচন কমিশনের কাজই হচ্ছে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসা।
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এটি ফিরিয়ে আনার জন্য যে মনোভাব দরকার, তা কারও মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। কেউ চায় না সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। আর সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। সেখানে কিছু সংস্কারে হতে পারে, তবে সেই ব্যবস্থা আবার ফিরিয়ে আনতে হবে।
পাশাপাশি সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, যারা নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত তাদের সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিতে হবে। তারা এখনো জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। আস্থা অর্জন করতে হবে।
ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় নায়ক ভোটারদের অপমান করা হচ্ছে। ভোটাররা ভোটের দিন ক্ষমতায়িত বোধ করেন, সেটি আবার কবে ফিরে পাব- সেটিই আমাদের এখন মূল প্রশ্ন।
এ সময় ভোটারদের গুরুত্বহীন করে তোলা হয়েছে উল্লেখ করে কবে আমর এটা ফেরত পাব- এমন প্রশ্ন রাখেন তিনি।
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আসন্ন পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে কিছুটা অন্তত স্পষ্ট হবে আমরা কোনদিকে যাচ্ছি। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছিল। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু হয়নি। এরপর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনও সুষ্ঠু হয়নি। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। গত নির্বাচনে বিরোধীদল অংশ নিয়েছিল। এবার ভোটারদের সামনে কোনো বিকল্প থাকবে না। বিরোধী দল অংশ না নেওয়ায় এবারের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও গ্রহণযোগ্য হবে না। অতীতে দেখা গিয়েছে, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি হস্তক্ষেপ না করে তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়।
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে সুজনে’র সহ-সভাপতি বিচারপতি এম এ মতিন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ড. এম সাখাওয়াত হোসেন, সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান, অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, অধ্যাপক আসিফ নজরুল প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত