নির্বাচনে অংশ নিতে তিনটি বিকল্প কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে নিবন্ধন হারানো জামায়াতে ইসলামী। দলটির অগ্রাধিকার আইনি লড়াইয়ে নিবন্ধন ফেরত পাওয়া। 'পরিবেশ পরিস্থিতির' পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তা সম্ভব নয়- নিশ্চিত হয়ে ভিন্ন নামে নিবন্ধনের চেষ্টা করছে জামায়াত। এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে নিবন্ধিত কোনো ছোট দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে, সেই দলের প্রার্থী হবেন জামায়াত নেতারা।
দলটির নেতাদের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এরই অংশ হিসেবে গতকাল বুধবার 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)' নামে নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আবেদন করা হয়েছে। জামায়াতের নিচের সারির অপরিচিত নেতাদের এ দলের নেতৃত্বে আনা হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত ২১টি দল নিবন্ধন চেয়ে আবেদন করেছে। বিডিপি ছাড়াও আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে জামায়াতের সম্পৃক্ততার কথা শোনা যাচ্ছে।
তবে জামায়াত ও বিডিপির নেতারা পারস্পরিক সম্পৃক্ত- তথ্যের সত্যতা অস্বীকার করেছেন। জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ বলেছেন, 'জামায়াত নামে দল একটিই। কেন অন্য নামে দল গঠন করব?' বুধবার রাতে বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল বা অবৈধ হয়নি। আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক গঠনতন্ত্রের কারণে ২০১৩ সালের ১ আগস্ট জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেন হাইকোর্ট। নতুন নামে নিবন্ধন পেতে জামায়াতের প্রচেষ্টার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আলমগীর হোসেন বলেছেন, 'কেউ যদি যুদ্ধাপরাধী না হয় এবং তাদের গঠনতন্ত্র যদি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, তাহলে শর্ত পূরণ করে ভিন্ন নামে নিবন্ধন পেতে আইনে বাধা নেই।'
সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও বিডিপির 'শীর্ষ নেতাদের' নাম-ঠিকানা জামায়াতের কাছেই পেয়েছে সমকাল। বিডিপির সভাপতি আনোয়ার হোসেন একসময় বিএনপি করতেন। পরে তিনি জামায়াতে যোগ দেন। ডেমরা থানার আমির হন। এমন তথ্যের সত্যতা অবশ্য অস্বীকার করেছেন দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াত নেতাদের বরাতে তিনি দাবি করেন, ডেমরা থানা আমিরের নাম আনোয়ার হোসেন নয়। এ নামেই কেউ ছিল না।
নতুন নামে দল করার চেষ্টা জামায়াতের নতুন নয়। মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করায় নিষিদ্ধ হয়ে জামায়াত পঁচাত্তরের পর মাওলানা আবদুর রহিমের নেতৃত্বে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ নামে ভোটের রাজনীতিতে অংশ নেয়। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট করে ছয়টি আসন জেতে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ। গোলাম আযমকে নেপথ্যে রেখে আব্বাস আলী খানকে ভারপ্রাপ্ত আমির করে পরবর্তী সময়ে নিজ নামে নির্বাচনে ফেরে জামায়াত।
২০০৮ সালের নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বড় ইস্যুতে পরিণত হলে ভোটে ভরাডুবি হয় জামায়াতের। মাত্র দুটি আসনে জেতে। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার দায় থেকে মুক্তি পেতে এর পর আবারও নতুন নামে দল গঠনের দাবি ওঠে জামায়াতে। দলটির তৎকালীন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ২০১০ সালে কারগার থেকে চিঠিতে একই পরামর্শ দেন। তবে জামায়াতের তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামীসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা এর বিরোধী ছিলেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাঁদের সবার ফাঁসি কার্যকরের পর মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে আহ্বান জানিয়ে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে জামায়াত ছাড়েন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। ওই সময়ে জামায়াতের বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি হয়েছিল নতুন নামে দল গঠনে। এরই ধারাবাহিকতায় জন্ম বিডিপির।
সেই কমিটির সদস্য ডা. তাহের অবশ্য বলেছেন, 'বিডিপি বা অন্য নামে কোনো দল গঠনে দলীয়ভাবে সম্পৃক্ততা নেই জামায়াতের। কারও ব্যক্তিগত উদ্যোগ হতে পারে।' জামায়াতের সাবেক এই এমপি বলেছেন, 'ইসলামী ছাত্রশিবিরের সব নেতাকর্মী জামায়াতে আসে না। অন্য দলে চলে যায়। নিবন্ধিত অনেক দল আছে, যেখানে শিবিরের ছেলেরা আছে। তার মানে কি ওই দল জামায়াতের বেনামি সংগঠন?'
একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রতীকে প্রার্থী হয়েছিলেন জামায়াত নেতারা। জামায়াতের দাবি ছিল অন্তত ৩৫ আসন। কিন্তু মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনের আগের রাতে জামায়াতকে ২৫টি আসনে মনোনয়নের দলীয় চিঠি দেয় বিএনপি। প্রতীক বরাদ্দের সময় তিনটি আসন কমিয়ে দেয়। যেখানে জামায়াত নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন, সেখানেও মনোনয়নের কাগজ জটিলতায় পড়েন।
আগের তিক্ত অভিজ্ঞতায় এবার ভোটের ১৫ মাস আগেই নিবন্ধনে মনোযোগী জামায়াত। যদিও দলটির নেতারা বিএনপির সুরে বলছেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রেখে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে ভোটে অংশ নেবেন না। ডা. তাহের সমকালকে বলেছেন, 'নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচনের প্রশ্নই আসে না।' তাঁর দাবি, নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হলে আপিল বিভাগের নিরপেক্ষ রায়ে নিবন্ধন ফিরে পাবে জামায়াত। তিনি বলেছেন, 'এই সরকারও থাকবে না। এই ইসিও থাকবে না। তখন নিবন্ধন সমস্যাও থাকবে না।'
নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা বিডিপির জেনারেল সেক্রেটারি মুহা. নিজামুল হক ইসলামী ছাত্রশিবিরের কার্যকরী পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি বর্তমানে মাতুয়াইল থানা জামায়াতের আমির। জামায়াত নেতাদের কাছে তাঁর ফোন নাম্বার পাওয়া যায়। এ বিষয়ে নিজামুল হক বলেছেন, 'সব দলের সঙ্গেই তো যোগাযোগ আছে।'
সংস্কারের দাবি তুলে জামায়াত থেকে বেরিয়ে যাওয়া ও বহিস্কার হওয়া নেতাদের দল এবি পার্টিও নিবন্ধনের আবেদন করেছে। ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু দলটির সদস্য সচিব। তিনি বলেছেন, নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশন যেসব শর্ত দিয়েছে, তা পূরণ করা খুবই কঠিন। ২১ জেলায় অফিস ও কমিটি এবং ১০০ উপজেলায় ২০০ ভোটারের সমর্থনের শর্ত পূরণে এবি পার্টির দেড় থেকে দুই বছরের বেশি সময় লেগেছে।
বিডিপি কত তারিখে গঠিত হয়েছে তা বলতে পারেননি দলটির জেনারেল সেক্রেটারি নিজামুল হক। তিনি জানান, গত ২৬ মে নির্বাচন কমিশন নিবন্ধনের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পর বিডিপি গঠন করা হয়। দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন ছাড়া কেন্দ্রীয় ও জেলা কমিটির নেতা কারা তা তিনি বলতে পারেননি। তাঁর দাবি, টানা দুই মাস কাজ করে ইসির শর্ত পূরণ করা হয়েছে। ২১ জেলা কমিটি, অফিসসহ সব শর্ত পূরণ করা হয়েছে। ৫০ হাজার পৃষ্ঠার নথি আবেদনের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে। মাত্র দুই মাসে কীভাবে এত বিশাল কাজ সম্পন্ন করলেন- প্রশ্নে তিনি বলেছেন, 'তাহলে তো দুই মাসের সব কাজ আবার নতুন করে দেখাতে হবে।'
২০০৮ সালে জামায়াতসহ ৩৮টি দলকে নিবন্ধন দেয় ইসি। আগের দুই কমিশনও নিবন্ধনের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল। তবে কোনো দলই ইসি থেকে নিবন্ধন পায়নি। আদালতের রায়ে কয়েকটি দল নিবন্ধন পেয়েছে। বিডিপি পাবে কিনা- প্রশ্নে নিজামুল বলেছেন, তাঁরা খুবই আশাবাদী।
জামায়াতের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, কয়েকটি নিবন্ধিত দলে জামায়াতের লোকজন রয়েছে। একটি দলের ৯৫ ভাগ জনশক্তিই জামায়াতের। কিন্তু একটি দলের শীর্ষ নেতাকে বাদ দিয়ে দখল করে নেওয়া অনৈতিক।
তবে জামায়াতের আরেক নেতা জানিয়েছেন, নতুন নামে নিবন্ধন না পেলে শেষ উপায় হলো, নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এমন একটি দলের নামে প্রতীকে ভোটে অংশ নেওয়া। আগামী নির্বাচনে জোট হলেও বিএনপির প্রার্থী হবেন না জামায়াত নেতারা। নতুন দল বা নিয়ন্ত্রণ আছে এমন কোনো ছোট দলের মনোনয়ন নিয়ে প্রার্থী হবেন। দাঁড়িপাল্লার প্রতীক জব্দ হওয়ায় জোট হলে বিএনপির 'ধানের শীষ' প্রতীক ব্যবহার করবেন।
পিএসএন/এমঅাই
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত