
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাম্প্রতিক গোয়েন্দা পর্যালোচনায় দেশের মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ব্যবস্থার এক হতাশাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। কাগজ-কলমে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সাড়ে আট লাখ ছাড়িয়ে গেলেও তাদের বিশাল একটি অংশ এনবিআরের রাজস্ব নেটওয়ার্কের বাইরে রয়ে গেছে। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সিংহভাগই নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করছে না, আর যারা দাখিল করছে তাদের বড় একটি অংশ ব্যবসায়িক লেনদেন ‘শূন্য’ দেখাচ্ছে। ফলে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও আদায়ের সার্বিক চিত্রে কোনো ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, গত জুলাই মাসে দেশে নিবন্ধিত মোট আট লাখ ৩০ হাজার ২৩২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাত লাখ ৪১ হাজার ৭৪৫টি প্রতিষ্ঠান কোনো ভ্যাট প্রদান করেনি কিংবা রিটার্ন জমা দেয়নি। অর্থাৎ নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮৯ দশমিক ৩৪ শতাংশই রাজস্ব খাতে কোনো অবদান রাখেনি। পুরো মাসে মাত্র ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ বা ৮৮ হাজার ৪৮৭টি প্রতিষ্ঠান রিটার্নে ভ্যাট প্রদর্শন করেছে। আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, পাঁচ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান আদৌ কোনো রিটার্ন জমা দেয়নি, যা মোট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের অর্ধেকেরও বেশি। অন্যদিকে যারা রিটার্ন জমা দিয়েছে, তাদের মধ্যে এক লাখ ৭৩ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান নিজেদের লেনদেন শূন্য দেখিয়ে রিটার্ন দাখিল করেছে।
জুলাই মাসে সারাদেশে মোট ভ্যাট জমা হয়েছে তিন হাজার ২৬৬ কোটি টাকার কিছু বেশি। তবে এই বিপুল রাজস্বের সিংহভাগই এসেছে হাতেগোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। মাত্র ৩৩৭টি প্রতিষ্ঠান থেকে আদায় হয়েছে দুই হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা, যা মোট ভ্যাটের প্রায় ৮০ দশমিক ৬৭ শতাংশ। তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, দেশের মাত্র শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এনবিআরের ভ্যাট আয়ের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে অবশিষ্ট আট লাখ ২৯ হাজার ৮৯৫টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সব মিলিয়ে মাত্র ৬৩১ কোটি টাকা ভ্যাট জমা হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানপ্রতি গড়ে মাসিক মাত্র সাত হাজার ৬০০ টাকা। তবে এই গড়ের মধ্যে রিটার্ন না দেওয়া ও শূন্য রিটার্ন দেওয়া প্রতিষ্ঠানও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বড় বড় করদাতাদের ওপর তদারকির ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান শিথিলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশের সবচেয়ে বড় করদাতা হিসেবে বিবেচিত বৃহৎ করদাতা ইউনিটে (এলটিইউ-ভ্যাট) নিবন্ধিত ১১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৪টি প্রতিষ্ঠান উক্ত মাসে কোনো রিটার্ন জমা দেয়নি। পাশাপাশি আঞ্চলিক কমিশনারেটগুলোর অবস্থাও নাজুক। ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মাত্র ২৪ শতাংশ রিটার্ন জমা দিয়েছে। ঢাকা পশ্চিমে রিটার্ন জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশই ছিল শূন্য রিটার্নদাতা। একইভাবে পর্যটননগরী কক্সবাজারসহ রাজশাহী, রংপুর ও যশোর ভ্যাট কমিশনারেটে এই শূন্য রিটার্নের হার ৬৮ থেকে ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৪১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে একক খাত হিসেবে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে ভ্যাট আদায়ে, যার পরিমাণ ২০ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। এনবিআর সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম থাকা সত্ত্বেও রিটার্ন না দেওয়া এবং লেনদেন গোপন করে শূন্য রিটার্ন দেওয়ার প্রবণতা প্রতিরোধ করতে না পারলে এই ভয়াবহ ঘাটতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। পরিস্থিতি উত্তরণে ভ্যাট নিরীক্ষা ও গোয়েন্দা দপ্তর থেকে ইতিমধ্যেই এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। সেখানে ভ্যাট আয়ের পরিধি বাড়াতে নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল, খেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান এবং সন্দেহভাজন ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর অডিটের আওতায় আনার জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত