গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করলে এই আগ্রাসনের পক্ষে সুর মিলিয়েছিল কেবল দুই স্বৈরশাসিত দেশ: উত্তর কোরিয়া ও মিয়ানমার। কিন্তু সেসময় বেশ দৃষ্টিকটুভাবে জাতিসংঘে রুশ আগ্রাসনের নিন্দা প্রস্তাবে ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল এশিয়ার সবচেয়ে জনবহুল দুই দেশ চীন এবং ভারত। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মাত্রই রাশিয়া সঙ্গে ‘সীমাহীন’ বন্ধুত্বের ঘোষণা দিয়েছিলেন। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর তথাকথিত নিরপেক্ষ অবস্থান অনেকের কাছেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি নীরব সমর্থন বলে মনে হয়েছিল। অন্তত রুশ গণমাধ্যমগুলো বিষয়টিকে সেভাবেই উপস্থাপন করছিল।
এ কারণেই হয়তো গত সপ্তাহে উজবেকিস্তানের সমরখন্দে ভারত-রাশিয়ার শীর্ষনেতাদের বৈঠক এতটা উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) বার্ষিক সম্মেলনে পার্শ্ববৈঠক হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এটি। বৈঠকে নরেন্দ্র মোদী প্রকাশ্যে সাত মাস ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমালোচনা করেন। পুতিনের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমি জানি, আজকের যুগ যুদ্ধের যুগ নয়। আর আমি আপনার সঙ্গে ফোনেও এ বিষয়ে কথা বলেছি।
এসময় পুতিনের জবাবও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি মোদীর উদ্বেগের বিষয়টি স্বীকার করেন এবং যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধ শেষ করতে সম্ভাব্য সব কিছু করার প্রতিশ্রুতি দেন। তার এই আশ্বাস অবশ্য কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। সম্মেলনে পুতিন আরও জানান, যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে চীনও ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে উদ্বেগ জানিয়েছে।
শি জিনপিং কিংবা নরেন্দ্র মোদী কেউই পুতিনের সঙ্গ ছাড়বেন না। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রুশ তেলের বৃহত্তম ক্রেতা হয়ে উঠেছে দেশ দুটি। তার ওপর, রুশ অস্ত্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ভারত। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অস্ত্রের প্রশ্নবিদ্ধ কার্যকারিতা ভারতকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। দেশটি পশ্চিমাদের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা বাদ দেওয়ার এটিও অন্যতম কারণ হতে পারে।
তাছাড়া, পুতিনের যুদ্ধের প্রভাবে খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দুই এশীয় নেতার মাথাব্যথার আরও একটি কারণ। ইউক্রেনে বেসামরিক লোকদের ওপর রাশিয়ার বর্বরতা সংগঠনের জন্যেও বিব্রতকর। সেখানে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে ভারত।
সর্বোপরি, শক্তিশালী নেতারা সাধারণত পরাজিত লোকদের ঘৃণা করেন। ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিনকেও পরাজিতই মনে করছে পশ্চিমারা। তাদের মতে, সমরখন্দ থেকে ফেরার সময় রিজার্ভ বাহিনী ডাকা এবং অধিকৃত ইউক্রেনের অংশগুলোকে রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত রুশ প্রেসিডেন্টের হতাশারই প্রতিচ্ছবি, শক্তিমত্তার নয়।
সমরখন্দে মোদী পুতিনের সমালোচনা করার পেছনে আরও একটি কারণ থাকতে পারে। ভারত বহুদিন ধরেই মধ্য এশিয়াকে এমন প্রতিবেশী ভাবে, যেখানে তার অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা উভয় ধরনের স্বার্থ রয়েছে। কিন্তু এ অঞ্চল ও ভারতের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে চিরশত্রু পাকিস্তান এবং এখন তালেবান-শাসিত আফগানিস্তান।
এ কারণেই ভারত তার উচ্চাঙ্ক্ষাকে রাশিয়ার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন থিংক-ট্যাংক এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সি. রাজা মোহন। স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে বিশেষ সুবিধা পেয়েছিল ভারত। আর সম্প্রতি চীনের নেতৃত্বাধীন এসসিও’তে ভারতের অন্তর্ভুক্তির জন্য লবিংও করেছে রাশিয়া। তবে এখন ইউক্রেন যুদ্ধ মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার প্রভাব ক্রমেই দুর্বল করে দিচ্ছে, সঙ্গে ভারতেরও।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত