৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রহস্য উদঘাটনের কথা জানিয়েছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন। ঘটনার ১০ বছর পার হলো আজ শুক্রবার (১১ ফেব্রুয়ারি)। এখনও সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের কিনারা করতে পারেননি তদন্তকারী কর্মকর্তারা। হত্যাকাণ্ডের দুমাস পরই আদালতের নির্দেশে তদন্তভার গ্রহণ করে র্যাব। লাশ কবর থেকে উঠিয়ে ময়নাতদন্ত করা হয়। গ্রেফতার করা হয় কয়েকজন আসামিকেও। এরপর দৃশ্যত আর কোনও অগ্রগতি হয়নি ওই মামলার।
৮৫ বারের মতো আদালতে প্রতিবেদন দেওয়ার সময় পিছিয়েছে। ইচ্ছে করে দেরি করার কারণেই বিচার হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন সাগর-রুনির পরিবারের সদস্যরা। এ ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা হিসেবেও দেখছেন বিশ্লেষকরা। র্যাব বলছে, মামলাটির তদন্ত গুরুত্বের সঙ্গে চলছে। আমেরিকায় পাঠানো ডিএনএ টেস্ট-এর ফল এলে অনেক বিষয় পরিষ্কার হবে।
ক্ষোভ এবং হতাশা জানিয়ে রুনির ছোট ভাই মামলার বাদী নওশের আলম বলেন, ‘তদন্তকাজের দীর্ঘসূত্রিতার কারণেই আলোর মুখ দেখছে না এ মামলা। আমার মা কিছুদিন আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন মেয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ার কষ্ট নিয়ে। সময় যতই গড়াচ্ছে ততই হতাশা বাড়ছে আমাদের। তদন্তকারী সংস্থার অদক্ষতার কারণেই বিচার হচ্ছে না।’
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মহাসচিব নূর খান বলেন, ‘রাজধানীর মতো একটি জায়গায় সাংবাদিক দম্পতি হত্যার তদন্তে ১০ বছর পেরিয়ে গেছে, এটা অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। এখন পর্যন্ত মামলার কী অগ্রগতি এবং অপরাধী শনাক্ত হয়েছে কিনা, এসব নিয়ে স্পষ্ট কোনও ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। তদন্তকারী কর্মকর্তারা কোনও ক্লু বের করতে পারছেন না, এ দুর্বলতা মেনে নেওয়া কঠিন। আরও গুরুত্ব দিয়ে এ ঘটনার তদন্ত করা জরুরি। তা না হলে মানুষের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে।’
তদন্তকারী সংস্থা র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘সাংবাদিক দম্পতি হত্যা ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে চলছে। বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। আমেরিকায় পাঠানো ডিএনএ স্যাম্পলের পরীক্ষার রিপোর্ট দ্রুত পাওয়ার বিষয়েও চেষ্টা চলছে। আদালতে অগ্রগতির বিষয়টিও বিভিন্ন সময় অবহিত করা হয়েছে।’
র্যাব জানিয়েছে, অন্যান্য সংস্থা থেকে পাওয়া প্রতিবেদন ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ—এসব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মামলার ভিকটিম মিডিয়াকর্মী হওয়ায় তদন্তকালে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। মামলার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাগর-রুনির ছেলে মাহির সরোয়ার মেঘকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার জবানবন্দিও নেওয়া হয়েছে।
র্যাবের গণমাধ্যম শাখা আরও জানায়, এখন পর্যন্ত ১৬০ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। ৮ জন আসামিকে বিভিন্ন সময় রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কেউ ঘটনার দায় স্বীকার করেনি। তদন্ত করতে গিয়ে আরও তথ্যপ্রমাণ যাচাইয়ের জন্য কিছু ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট এখনও হাতে আসেনি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শামীম সরদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তদন্তে আর কত সময় লাগবে সেই ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবে আরও সময়ক্ষেপণ হতে থাকলে তদন্তকারী সংস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে।’
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনি। পর দিন ভোরে তাদের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় রুনির ভাই বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলার পর রুনির কথিত বন্ধু তানভীর রহমানসহ আট জনকে গ্রেফতার করা হয়। বাকিরা হলেন—রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মিন্টু ওরফে বারগিরা মিন্টু ওরফে মাসুম মিন্টু, কামরুল হাসান অরুণ, পলাশ রুদ্র পাল, আবু সাঈদ ও বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবির।
সাংবাদিকদের সংগঠন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) পক্ষ থেকে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড দিবস উপলক্ষে তিন দিনের কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় ডিআরইউ চত্বরে মোমবাতি প্রজ্বলন করা হয়। এছাড়া, শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় ডিআরইউ চত্বরে প্রতিবাদ সমাবেশ হবে। রবিবার সকালে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হবে।
পিএসএন/এমঅাই
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত