
বাগেরহাটের মোংলায় শিকারিদের ফাঁদ থেকে উদ্ধার হওয়া সুন্দরবনের সেই আহত বাঘিনী দীর্ঘ পাঁচ মাসের চিকিৎসায় এখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে। তবে তাকে পুনরায় বুনো পরিবেশে অবমুক্ত করার বিষয়ে একমত হতে পারছেন না বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা। বাঘিনীর বয়স, শিকারের সক্ষমতা এবং গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ‘স্যাটেলাইট কলার’ বা ‘মাইক্রোচিপ’ ব্যবহারের পক্ষে-বিপক্ষে মত আসায় তাকে সুন্দরবনে ছাড়ার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে। অন্যদিকে, খুলনা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন এই বাঘিনীর খাদ্য ও ওষুধের পেছনে প্রতি মাসে সরকারের ব্যয় হচ্ছে দুই লাখ টাকারও বেশি।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাঘিনীকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করার বিষয়ে গত ২১ মে উপ-প্রধান বন সংরক্ষক মো. জাহিদুল কবিরের সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের জুম মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শীর্ষ বিশেষজ্ঞ এবং বাঘ গবেষকরা অংশ নেন। সভায় বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বাঘিনীটির বয়স বিবেচনায় তার নিরাপত্তা ও গতিবিধি নজরদারিতে রাখতে শরীরে ‘স্যাটেলাইট কলার’ কিংবা ‘মাইক্রোচিপ’ স্থাপনের পরামর্শ দেন। বন্যপ্রাণী গবেষক অধ্যাপক এম এ আজিজ জানান, ভারতের সুন্দরবন অংশেও এমন ছয়টি বাঘের শরীরে স্যাটেলাইট কলার লাগানো হয়েছে। তবে খুলনা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল জানান, এই প্রযুক্তি বর্তমানে বন বিভাগের কাছে নেই এবং এটি আমেরিকা থেকে আমদানি করতে আরও দুই-তিন মাস সময় লাগবে, যা বেশ ব্যয়বহুল।
বাঘিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বন কর্মকর্তা ও গবেষকদের মধ্যে তীব্র ভিন্নমত তৈরি হয়েছে। বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক ছানাউল্যা পাটওয়ারী জানান, বাঘের সর্বোচ্চ জীবনকাল ১৫ বছর, আর এই বাঘিনীটির বয়স বর্তমানে ১০ থেকে ১১ বছর। দীর্ঘ দিন খাঁচায় থাকায় তার বন্য পরিবেশে শিকারের সক্ষমতা স্বাভাবিকের চেয়ে কমেছে। ফলে বন্য পরিবেশে অন্য পশুর সঙ্গে লড়াই করে তার টিকে থাকার সম্ভাবনা কম। এ কারণে তিনি বাঘিনীটিকে বনে না ছেড়ে কোনো সাফারি পার্কে রাখার পরামর্শ দেন। এর বিপরীতে অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, বাঘিনীটি যদি মুক্ত অবস্থায় একদিনও বাঁচতে পারে, সেটাই বড় পাওয়া। তার নিজের বসতিতে বাঁচার ও মৃত্যুর অধিকার আছে। সাফারি পার্কে বন্দী রাখলে প্রাণীটি প্রাকৃতিক মৃত্যুর অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
বর্তমানে পুনর্বাসন কেন্দ্রে বাঘিনীটিকে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ কেজি তাজা মাংস খাওয়াতে হচ্ছে। ডিএফও নির্মল কুমার পাল জানান, খাদ্য ও নিয়মিত ওষুধের কারণে প্রতি মাসে খরচ হচ্ছে দুই লাখ টাকার বেশি। তবে নিবিড় পরিচর্যায় বাঘিনীটির সামনের বাঁ পায়ের ক্ষতস্থান এখন সম্পূর্ণ ঠিক হয়ে নতুন চামড়া ও লোম গজিয়েছে। বাঘিনীটি তার ক্ষিপ্রতা ফিরে পেয়েছে এবং এখন দ্রুত গতিতে হাঁটতে পারছে।
বন অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমদ জানান, ২০২৪ সালে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে এই বাঘিনীটিকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তিনবার শনাক্ত করা হয়েছিল। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে লোকালয় থেকে সবচেয়ে দূরের গহীন বনে তাকে অবমুক্ত করা হবে। চলতি জুন মাসেই এ বিষয়ে আরেকটি চূড়ান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। প্রযুক্তি স্থাপনের সিদ্ধান্ত না হলে, জুনের শেষে অথবা জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই বাঘিনীকে সুন্দরবনে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছে বন বিভাগ।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি সুন্দরবনের শরকির খাল এলাকা থেকে শিকারিদের ফাঁদে রক্তাক্ত অবস্থায় এই বাঘিনীটিকে উদ্ধার করে বন বিভাগের একটি বিশেষায়িত দল। পরে পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ পাঁচ মাস চিকিৎসায় ৮০ কেজি ওজনের বাঘিনীটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত