
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ময়মনসিংহের রাজনীতিতে এখন অন্যতম আলোচ্য বিষয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ। জেলার ১১ আসনের মধ্যে আটটিতে ধানের শীষের বিরুদ্ধে লড়ছেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা। দলের মনোনয়নপ্রাপ্তদের জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজেদেরই বড় অংশ।
স্থানীয় নেতাকর্মী ও ভোটাররা বলছেন, এই আট আসনে বিএনপির মূল চ্যালেঞ্জ এখন জামায়াত জোট নয়, বরং নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ। আসনগুলোর কয়েকটিতে ধানের শীষের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী নিজ দলীয় লোক। এদিকে ময়মনসিংহ-৬ আসনে (ফুলবাড়িয়া) জামায়াতে ইসলামীতেও আছেন বিদ্রোহী প্রার্থী।
ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া)
সীমান্তঘেঁষা ময়মনসিংহ-১ আসনে বিএনপি থেকে কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স মনোনয়ন পেলেও তাঁর জয়ের পথ মসৃণ নয়। প্রতীক বরাদ্দের পর বহিষ্কৃত উত্তর জেলা বিএনপির নেতা ও ব্যবসায়ী সালমান ওমর রুবেল এলাকায় বেশ সক্রিয়। তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে রাস্তা সংস্কার, সেতু নির্মাণ, টিউবওয়েল স্থাপন, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও চক্ষুশিবির পরিচালনা এবং দলের ৩১ দফার প্রচারসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন দীর্ঘদিন থেকেই। ঘোড়া প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন তিনি। এই আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মো. তাজুল ইসলামের প্রতীক রিকশা।
ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা)
ময়মনসিংহ-২ আসনে মোতাহার হোসেন তালুকদারের প্রতীক ধানের শীষ। তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ২০০১ সালে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করা বিএনপির সাবেক এমপি শাহ শহীদ সারোয়ার। তবে তিনি ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নিয়ে দল থেকে বহিষ্কার হন। তিনি লড়বেন ঘোড়া প্রতীক নিয়ে। এই আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহাম্মদুল্লাহর প্রতীক রিকশা। ইসলামী আন্দোলন মনোনীত হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী গোলাম মাওলা ভূঁইয়া।
ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর)
বিএনপির প্রার্থিতা নিয়ে সহিংসতায় ময়মনসিংহ-৩ আসনে একজনের প্রাণ গেছে। এখানে ধানের শীষের প্রার্থী প্রকৌশলী এম ইকবাল হোসেইন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত আহ্বায়ক আহম্মদ তায়েবুর রহমান হিরনের প্রতীক ঘোড়া।
সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হিরনের অনুসারীরা মনে করেন, তৃণমূলের অধিকাংশ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের পছন্দের বিষয় দলের মনোনয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পায়নি। ভোটব্যাংক এবং ত্যাগ-তিতিক্ষার মূল্যায়ন না করে হিরনকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এই আসনে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় ছাত্রদল নেতার মৃত্যুর পর হিরনসহ পাঁচজনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে নির্বাচনী মাঠ ছাড়েননি হিরন।
এ ছাড়া এই আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) মনোনীত কাঁচি প্রতীকের প্রার্থী এ কে এম আরিফুল হাসান মাঠে আছেন।
ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া)
নির্বাচন সামনে রেখে ময়মনসিংহ-৬ আসনে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ধানের শীষের প্রার্থী আখতারুল আলম ফারুক। অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে আছেন তাঁর চাচি আখতার সুলতানা। সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার শামছ উদ্দিন আহমদের (প্রয়াত) স্ত্রী আখতার সুলতানা ধানের শীষের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।
এই নাটকীয়তার সূত্রপাত হয় সাবেক উপজেলা বিএনপি সভাপতি শামছ উদ্দিন আহমদের ছেলে আমেরিকা প্রবাসী তানভীর আহমেদ রানাকে ঘিরে। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে যাচাই-বাছাই শেষে দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে তানভীরের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। ছেলের প্রার্থিতা বাতিলের পর পারিবারিক প্রভাব ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াইয়ে থাকার ঘোষণা দেন আখতার সুলতানা।
স্থানীয় রাজনীতিকরা মনে করছেন, আখতার সুলতানার প্রতি দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ সহানুভূতিশীল। এটি ভোটের সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জেলা নায়েবে আমির অধ্যক্ষ কামরুল হাসান মিলন। তবে তাঁর প্রার্থিতা মেনে নেননি জেলা জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক জসিম উদ্দিন ও তাঁর অনুসারীরা। তারা অধ্যক্ষ মিলনকে এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে মিছিল করেছেন। দলীয় পদ স্থগিত হওয়া সত্ত্বেও জসিম উদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। তিনি সারাদেশে জামায়াতের একমাত্র বিদ্রোহী প্রার্থী বলে জানা গেছে।
ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল)
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ডা. মাহাবুবুর রহমান লিটন ময়মনসিংহ-৭ আসনে ধানের শীষ প্রতীক পেলেও তা উপজেলা বিএনপির একাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এই আসনে সবচেয়ে বড় ‘ফ্যাক্টর’ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বিএনপি পরিবারের আরেক নেতার। স্থানীয় অনেকেই মনে করছেন, সাবেক এমপি আবদুল খালেক সরকারের ছেলে ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার সাদত ব্যাপক সাড়া জাগাতে পারেন। তাঁর প্রতীক কাপ-পিরিচ। এদিকে দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধিতার কারণে বিএনপি ‘সিট’ হারাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নেতাকর্মীরা। এই আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আছাদুজ্জামান সোহেল।
ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল)
বিএনপি বনাম বিএনপি সমীকরণ তৈরি হয়েছে ময়মনসিংহ-৯ আসনে। নির্বাচনী ময়দানে ছয়জন প্রার্থী থাকলেও সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনোযোগ এখন ঘরোয়া লড়াইয়ের দিকে। এখানে ধানের শীষের প্রার্থী ইয়াসের খান চৌধুরীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তাঁর চাচি স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসিনা খান চৌধুরী।
সাবেক এমপি আনোয়ারুল হোসেন খান চৌধুরীর (প্রয়াত) ছেলে ইয়াসের খান চৌধুরী। ১৯৯১ সালে এই আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন আনোয়ারুল হোসেন। তাঁর পরিচ্ছন্ন ইমেজের একটি বড় প্রভাব এলাকায় আজও আছে। বাবার জনপ্রিয়তা ও দলীয় প্রতীককে পুঁজি করে ইয়াসের খান জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী হলেও তাঁর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন হাসিনা খান। স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসিনা খান সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত খুররম খান চৌধুরীর স্ত্রী। খুররম খান ছিলেন আনোয়ারুল হোসেনের ছোট ভাই। খুররম খানের অনুসারী নেতাকর্মীরা এখন জোটবদ্ধ হয়েছেন হাসিনা খানের হাঁস প্রতীকের পক্ষে।
ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও)
সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ময়মনসিংহ-১০ আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ এখন তুঙ্গে। দীর্ঘদিনের ‘আওয়ামী লীগ দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার বিএনপি বড় জয়ের স্বপ্ন দেখলেও, দলীয় প্রার্থীর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী। দলের মূল ধারার নেতাকর্মীদের সমর্থন না থাকা এবং ধানের শীষের প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি নিয়ে বিতর্কের জেরে গফরগাঁও বিএনপিতে এখন চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এখানে বিএনপির মনোনয়ন পান আখতারুজ্জামান বাচ্চু। তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান সুলতানের ছোট ভাই এবি সিদ্দিকুর রহমান। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামায় বিএনপির অনেক নেতাকর্মী তাঁর পক্ষ নিয়েছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮৭ হাজার ভোট পেয়েছিলেন সিদ্দিকুর রহমান।
এ ছাড়া এই আসনে এলডিপির প্রার্থী সৈয়দ মাহমুদ মোর্শেদ ছাতা প্রতীকে লড়ছেন। আসনটি জোটগতভাবে উন্মুক্ত থাকায় জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মো. ইসমাঈলও নির্বাচনের লড়াইয়ে আছেন।
ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা)
ময়মনসিংহ-১১ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ফখরুদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর সঙ্গে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে হরিণ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মোর্শেদ আলম। ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চল বলে খ্যাত ভালুকার আসনে এই দুই প্রার্থী অর্থনৈতিকভাবে খুব শক্তিশালী। এলাকায় বিএনপির জনসমর্থন অনেক বেশি থাকলেও দলে বিভক্তির কারণে আসনটি হাতছাড়া হতে পারে।
এই আসনে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপির শাপলা কলি প্রতীকে ডা. জাহিদুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ ছাড়া গণঅধিকার পরিষদ মনোনীত ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম মাঠে আছেন।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত