
পরিবেশ সুরক্ষা ও দূষণ রোধে আগামী সরকারকে বায়ু ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণসহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করার সুপারিশ করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, এই সাত ইস্যুতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ ও কার্যকর বাস্তবায়ন হলে দেশের পরিবেশ পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।
গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে ‘ম্যানিফেস্টো টক ৪: রাজনৈতিক দলগুলোর সবুজ প্রতিশ্রুতি’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।
সংলাপে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আগামী সরকারের জন্য যে সাত দফা পরিবেশ এজেন্ডা তুলে ধরেন সেগুলো হলো–বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, বন পুনরুদ্ধার, শিল্পদূষণ রোধ, বন্যপ্রাণী সুরক্ষা, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
তিনি বলেন, নতুন সরকার যদি এই সাতটি খাতে মনোনিবেশ করে এবং প্রয়োজনীয় অর্থ দেয়, তাহলে পরিবেশদূষণ কমবে।
ইটভাটা নিয়ন্ত্রণসহ অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে ঢাকার বায়ুদূষণ পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলেও দাবি করেন উপদেষ্টা। তিনি জানান, ২০২৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বর-ডিসেম্বরে ঢাকা যতবার বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে ছিল, ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা কমেছে। এটি একটি ইতিবাচক লক্ষণ।
তবে জানুয়ারিতে আবার বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, প্রশাসন এখন নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান কিছুটা শ্লথ হয়েছিল। তবে বায়ুদূষণ বেড়ে গেলে তিনি নিজে উদ্যোগ নিয়ে আবার অভিযান জোরদার করেন। তিনি বলেন, ইটভাটা মালিকদের আইন মানতে হবে এবং এই অভ্যাস গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সাভার এলাকাকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করে সেখানে ইটভাটা বন্ধে অভিযান চালানো হয়েছে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ও একাধিক মামলার কারণে কাজ জটিল হলেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দিনে বন্ধ রেখে রাতে ইটভাটা চালানোর প্রবণতা দেখা গেলেও পরিবেশ অধিদপ্তর রাতেও অভিযান চালিয়েছে।
দূষণ নিয়ন্ত্রণে পুরোনো বাস ও যানবাহন বাতিলের (স্ক্র্যাপ) নীতি দীর্ঘদিন না থাকায় সমস্যা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, অবশেষে বিআরটিএ সেই নীতি চূড়ান্ত করেছে এবং শিগগিরই তা গেজেট আকারে প্রকাশ হবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব যাতায়াতের জন্য ১০০টি ইলেকট্রিক বাস আমদানির প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিমালা কার্যকর হয়েছে জানিয়ে রিজওয়ানা হাসান বলেন, পুলিশ সার্জেন্টদের সরাসরি জরিমানা করার ক্ষমতা দেওয়ায় হর্ন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আসবে। নেপালের মতো এই ব্যবস্থা মানুষের আচরণ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে।
সোনাদিয়া উপকূলীয় বনসহ প্রায় ২০ হাজার একর বনভূমি বেজা থেকে বন অধিদপ্তরের কাছে ফিরিয়ে আনার কথা উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, মধুপুর ও চুনতি অভয়ারণ্যে বন পুনরুদ্ধারের প্রকল্পও শুরু হয়েছে। নতুন বন আইনে প্রাকৃতিক বনে কোনো ধরনের পরিবর্তন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ঢাকার চারটি নদী ও ২০টি খাল পুনরুদ্ধারে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় একটি সমন্বিত প্রকল্পের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তুরাগ নদী খননে আলাদা প্রকল্প প্রস্তুত রয়েছে এবং বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধারে চীনা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তিনি দাবি করেন, ঢাকায় এবার দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা হয়নি, যা ছোট আকারের ও কম খরচের প্রকল্পগুলোর ফল।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, বিভাগীয় শহরগুলো থেকে রিসাইক্লিং ও সার উৎপাদন শুরু করতে হবে। উৎসস্থলেই বর্জ্য পৃথককরণ নিশ্চিত করা জরুরি।
পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার বন্ধে নাগরিকদের আচরণগত পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বাজারে গিয়ে পলিথিন নিলে পরে বলা ঠিক নয় যে পলিথিন বন্ধ হলো না–এই পরিবর্তন আমাদেরই শুরু করতে হবে।
স্বাধীনতার ৫৪ বছরে পুঞ্জীভূত পরিবেশগত সংকট ও অব্যবস্থাপনা মাত্র ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে পুরোপুরি সমাধান করা অবাস্তব বলে মন্তব্য করেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতির আধিক্য থাকলেও বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট পথরেখা না থাকায় হতাশা প্রকাশ করে উপদেষ্টা বলেন, রাজনৈতিক সস্তা জনপ্রিয়তার বাইরে এসে প্রকৃত দায়বদ্ধতা দেখাতে হবে।
আগামীর সরকারের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়ে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, যদি পরিবেশবান্ধব কাজ করা হয়, আমরা সহযোগিতা করব। তবে পরিবেশের বিরুদ্ধে গেলে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষা কোনো প্রান্তিক বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের মূল এজেন্ডা হওয়া উচিত। বর্তমান সরকার যে ভিত্তি তৈরি করছে, আগামী নির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপের ওপরই এর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত