
প্রকাশনা শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’ পবিত্র ঈদুল ফিতরের পরে আয়োজনসহ চার দফা দাবি জানিয়েছেন সাধারণ প্রকাশকরা। আগামী ৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এ বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে সুস্পষ্ট ঘোষণা না এলে বইমেলায় ২৬২ প্রকাশক অংশ না নেওয়ার হুঁশিয়ারি জানিয়েছেন।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাধারণ প্রকাশকদের পক্ষে এসব দাবি জানান ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) প্রকাশক এবং অমর একুশে বইমেলা কমিটি ২০২৬-এর সদস্য মাহরুখ মহিউদ্দিন।
প্রকাশকদের অন্য তিনটি দাবি হচ্ছে— স্টল ও প্যাভিলিয়ন ভাড়া মওকুফ ও সরকারি খরচে অবকাঠামো নির্মাণ করা; শিক্ষার্থী ও পাঠকদের জন্য সরকারি ‘বই-ভাতা’ বা প্রণোদনা চালু করা; এবং সরকারিভাবে প্রতিটি মানসম্মত বইয়ের ন্যূনতম ৩০০ কপি কিনে নেওয়া।
সংবাদ সম্মেলনে মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্প আজ এক চরম অস্তিত্ব সংকটে দাঁড়িয়ে আছে। অমর একুশে বইমেলা কেবল বই বিক্রির স্থান নয়, এটি আমাদের জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো— আন্তর্জাতিক জরিপে পাঠাভ্যাসে বাংলাদেশ ১০২ দেশের মধ্যে ৯৭তম, দেশে প্রকাশিত ৯৫ শতাংশ বইয়ের প্রথম মুদ্রণ ৩০০ কপি বা তার কম, আর এর ৭০ শতাংশ বই সেই কপিও বিক্রি হয় না। বিগত দেড় বছরে বই বিক্রি কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। উন্নত দেশে রাষ্ট্র যেখানে লাইব্রেরি ও পাঠকের জন্য হাজার হাজার কপি বই কিনে লেখক ও প্রকাশকদের সুরক্ষা দেয়, সেখানে আমাদের প্রকাশকরা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ঝুঁকিতে সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা থেকে বই প্রকাশ করে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় টিকে থাকা নিছক ব্যবসা নয়, এটি এক ধরনের আত্মত্যাগ বা ‘স্যাক্রিফাইস’। তাই প্রকাশনা শিল্প রক্ষায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং এবারের বইমেলা ঈদের পরে আয়োজন এখন সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে আমরা তিনটি বড় সংকটের মুখোমুখি। প্রথমত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা— ফেব্রুয়ারির শুরুতেই রোজা ও সামনে ঈদ থাকায় মানুষের ব্যয় পোশাক ও খাদ্যে কেন্দ্রীভূত থাকে, উপরন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রধান ক্রেতা শিক্ষার্থীরা ঢাকায় থাকবেন না; পাঠকশূন্য মেলায় স্টল নেওয়া নিশ্চিত লোকসান। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনকালীন লজিস্টিক সংকট— প্রেস ও বাইন্ডিং শ্রমিক এবং স্টল নির্মাণের কারিগর পাওয়া কঠিন, নির্মাণসামগ্রীর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, ফলে তাড়াহুড়ো করে মেলা আয়োজন বাস্তবসম্মত নয়। তৃতীয়ত, মানবিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা— স্টলের অধিকাংশ কর্মী শিক্ষার্থী; ঈদের আগে তারা বাড়ি যেতে চাইবেন, যা ঠেকানো অমানবিক, আর রোজা রেখে সারাদিন কাজ করে ইফতারের পর ক্লান্ত শরীরে স্টলে দাঁড়িয়ে কাজ করা তাদের ধর্মীয় অনুভূতি ও মানবিক অধিকারের পরিপন্থি।
প্রকাশকদের পক্ষ থেকে মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, এই সংকট কেবল ব্যক্তিগত নয়; দেশের সৃজনশীল প্রকাশকদের মূল সংগঠন বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির কাছে ইতোমধ্যে ২৬২ জন প্রকাশকের স্বাক্ষরিত চিঠিতে মেলা পেছানোর দাবি জানানো হয়েছে। আমরা সংস্কৃতি উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি, আজ এই সংবাদ সম্মেলনের পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছেও স্মারকলিপি দেব। তিনি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক হিসেবে আমাদের অবস্থান বুঝবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। এ প্রেক্ষাপটে আমরা চার দফা দাবি জানাচ্ছি— ঈদুল ফিতরের পর বইমেলা আয়োজনের ঘোষণা, স্টল ভাড়া মওকুফ ও সরকারি খরচে অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষার্থীদের জন্য বই-ভাতা চালু এবং সরকারিভাবে প্রতিটি মানসম্মত বইয়ের ন্যূনতম ৩০০ কপি ক্রয়ের নীতি প্রণয়ন। স্পষ্ট করে বলতে চাই, এসব দাবি মানা না হলে ৯ ফেব্রুয়ারির পর থেকে ২৬২ জন প্রকাশকসহ সাধারণ প্রকাশকদের পক্ষে আসন্ন বইমেলায় অংশগ্রহণ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমরা মেলা চাই, কিন্তু ধ্বংসের পথে যেতে চাই না।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন কাকলীর প্রকাশক এ কে নাসির আহমেদ, অন্যপ্রকাশের প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম, অ্যাডর্নের প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসাইন, আদর্শের প্রকাশক এবং অমর একুশে বইমেলা কমিটি ২০২৬-এর সদস্য মাহবুব রহমান প্রমুখ।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত