টাকা ফেরত না দিতেই চুরির ফাঁদ, হত্যার আগে না পরে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া স্পষ্ট নয়।
খুলনা (০১ অক্টোবর)
খুলনায় নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আয়মান মো . আজমুল হোসেন চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা উপজেলার বড় শলুয়া গ্রামের কৃষক পরিবারের সন্তান হলেও এলাকায় মেধাবী শির্ক্ষার্থী ছিলেন। ভাত চুরি করে খাওয়ার অপবাদ তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে হত্যার ১২ দিনেও ভাত চুরির অভিযোগ ও নির্যাতন করে চার তলার ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। দিন যতই যাচ্ছে ততই আজমুল হোসেন হত্যা মামলার রহস্য ততই ঘনীভুত হচ্ছে।
ভাত চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাকে পিটিয়ে হত্যার কারণ ফলাও ভাবে প্রচার করা হলেও এর পেছনের অন্য কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে, যেটি নিয়ে কাজ করছে পুলিশের তদন্ত টিম। নিজের আত্মরক্ষায় ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে শিক্ষার্থীর মৃত্যুর কথা বলা হলেও তার কোন সত্যতা এখনও পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনার রাতে আশপাশে থাকা অনেক প্রতক্ষ্যদর্শী মুখ খুলছেন না।
হত্যাকান্ড সম্পর্কে খুলনার একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, আজমুল হোসেন কৃষক পরিবারের সন্তান হলেও মেধাবী শির্ক্ষার্থী ছিলেন। উচ্চতর শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গত বছর বাড়ি থেকে খুলনায় আছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেও সেখানে চান্স পায়নি সে। বিষয়টি পরিবারের কাছে গোপন রেখে বলে সে চান্স পেয়েছে।
এর পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা হল গেট সংলগ্ন ইসলামাবাদ গলির একটি মেসের ম্যানেজার মেহেদীর সাথে পরিচয় হয়। মেহেদী গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সে ওই ভবনের যাবতীয় দায়িত্ব মালিকের কাছ থেকে বুঝে নিয়ে ম্যাচ পরিচালনার কাজটি করতো।
সূত্রটি আরও জানায়, তাকে খুবি’র সনদ পাইয়ে দিতে এক লাখ ২০ হাজার টাকা নেয় মেহেদী। এরপর আজমুলকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি করে দেয় মেহেদী। খুবি’র ছাত্রদের ভাড়া নেওয়া ওই ভবনে অন্যান্য ছাত্রদের সাথে সেখানে আজমুলও থাকতে শুরু করে। আর মেহেদীর পরামর্শে খুলনায় নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়।
কিছুদিন পার হওয়ার পর বিবেকে তাড়ানায় পরবর্তীতে বাড়িতে ফোন করে সব ঘটনা খুলে বললে পরিবার থেকে তাকে বাড়িতে ফিরে যাওয়ার তাড়া দেয়। কিন্তু সময় তখন অনেক দুর এগিয়ে যায়।
সূত্রটি আরও জানায়, আজমুলের কাছ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা ফেরত না দেওয়ার পরিকল্পনা করতে থাকে মেহেদী। আর বাস্তবায়নের দিনক্ষণের সুযোগে থাকে। প্রায় ওই ভবন থেকে টাকা, মোবাইল, ভাতসহ বিভিন্ন জিনিষ চুরি বিষয়ে আজমুলের দিকে সন্দেহের তীর ছুড়ে দেয় মেহেদি। এটি নিয়ে পরিবেশ ঘোলাটে করতে থাকে সে।
ঘটনার দিন (১৮) সেপ্টেম্বর রাতে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগ তুলে আকষ্মিক ওই ভবনের কয়েকজন বড়ভাই রুমের মধ্যে আজমুলকে মারধর করতে শুরু করে। পরবর্তীতে ছাদে নিয়ে তিনঘন্টা মারধর করা হয় তাকে।
তদন্ত সূত্রে উঠে এসেছে যে, ওই দিন রাত ১১টা থেকে রাত ১টারও বেশী সময় ধরে আজমুলকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের মাত্রা এমনই ছিল যে আজমুল দুই পায়ের উপর ভর করে দাড়াঁতেই পারছিলনা। এরপর ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ার নাটক সৃষ্টি করে প্রচার করা হয়। তবে তদন্তে এখনও স্পট নয় যে- আজমুলকে হত্যার পর ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে, নাকি নির্যাতনের এক পর্যায়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তবে আজমুল নিজেই পাশের বিল্ডিং’র তৃতীয় তলায় লাাফিয়ে পড়েছেন বলে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা বলছেন- তার সত্যতা পাওয়া যায়নি। চারতলার ছাদ থেকে পাশের বিল্ডিংয়ের কার্ণিসের উপর দাড়িয়ে তৃতীয় তলার ছাদে লাফ দেওয়া সম্ভব নয়। এদুটি ভবনের দুরত্ব অনেক। দুই ভবনের মাঝে সরু একটি রাস্তা রয়েছে।
গতকাল বুধবার ঘটনাস্থলে অনুসন্ধানে দেখা গেছে খাজা হল গেট সংলগ্ন ইসলাম নগরে সরোয়ারের বাড়ি থেকে পাশের বাড়ির ছাদের দুরত্ব ৬-৭ ফুট। বাড়ির ছাদে প্রায় চার ফুট কার্ণিস দেওয়া দেওয়ালের উপর থেকে একজন মানুষের পক্ষে পাশের বাড়ির ছাদে লাফ দেওয়া সম্ভব নয়। ওই ভবনের ছাদ থেকে পড়ে সে একটি সরু ড্রেনের মধ্যে পড়ে ছিল।
মেসের রাধুনী ফাতেমা বেগমের সাথে কথা হলে তিনি জানান, মেসের তৃতীয় তলায় থাকা ১০ জনের খাবার রান্না করেন। ওই দিন ভাতের গাবলা তিন তলা থেকে চতুর্থ তলায় আজমুলের ঘরে কিভাবে গেল তা তিনি জানেন না। আশপাশের বাসিন্দাদের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো কথা বলতে চাননি। তবে চুরির এবং চোর সন্দেহে আটক এক ব্যক্তিকে ধরে মারা হচ্ছে এমন খবর শুনে অনেকেই মারার জন্য অনেকে এগিয়ে যায়।
ওই ভবনে থাকা খুবি’র একজন শিক্ষার্থী বলেন, ঘটনার দিন আমি বাবার চিকিৎসা কাজে ঢাকায় গিয়েছিলাম। এসে খবর পাই, চোর সন্দেহে এ ভবনের একজন গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে। কিভাবে ছাদ থেকে পড়ে মারা গেল তা নিশ্চিত করে বলতে পারেনি। তবে তার কাছ থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় পত্র পাওয়া গেছে কিন্তু সে বিদ্যাপিঠের শিক্ষার্থী নয়।
হরিণটানা থানার অফিসার ইনচার্জ ইকবাল হোসেন জানায়, ভাত খাওয়া নিয়ে হত্যাকান্ডের মত একটা ঘটনা ঘটবে এটা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। এর পেছনে যে অন্য কোনো কারণ আছে সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি। এ মামলার প্রধান আসামি মেহেদীকে খুঁজে পাওয়া গেলে হত্যার কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। চোর বলে আখ্যা দেওয়ায় ৩০-৩৫ জন আশপাশ থেকে এসে মারধোরে অংশ নেয়।
এছাড়া ওইদিন মূলত চারজনের নেতৃত্বে আজমুলকে রাতে ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ভাত চুরির অপবাদ দিয়ে তাকে পিটিয়ে আহত করা হয়। ছাদ থেকে পড়ে তার মৃত্যু হয়েছে এটা নিশ্চিত। তবে তাকে ফেলে দিয়ে বা হত্যা বা হত্যা করার পর ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে কি না সেটা মেডিকেল রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হচ্ছেনা।
গত শুক্রবার (১৮) সেপ্টেম্বর গভীর রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল রোড – সংলগ্ন ইসলামনগর সড়কের একটি চারতলা ভবনের ছাদে ভাত চুরির অভিযোগ এনে আজমুলকে পেটানো হয়। তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি স্বজনদের।
এ ঘটনায় ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে নিহত আজমুলের বাবা কুতুবউদ্দিন বাদী হয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীসহ ২০-২৫ জন অজ্ঞাত আসামি করে হরিণটানা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় সর্বমোট চারজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা সবাই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দী দিয়েছেন।
অনুসন্ধানে আরো যা জানা গেল
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) দুটি ছাত্র হলের পাশেই আবাসিক এলাকা। হলে যারা আসন পান না, তাদের বেশিরভাগই ওই এলাকায় ভাড়া থাকেন। খুবির খানজাহান আলী হল ফটকের বিপরীতে ইসলামনগর মসজিদ গলিতে সরোয়ার হোসেন নামে চারতলার একটি মেস। মেসের চতুর্থ তলায় অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থাকতেন নগরীর নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেন।
তবে এজাহারে মেস ম্যানেজার মেহেদীর নাম নেই। মামলা দেওয়ার সময় তিনি সন্দেহের তালিকায় ছিলেন না বলে পরিবারের বরাতে পুলিশ জানিয়েছে। নিহতের বাবা কুতুব উদ্দীন বলেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার কথা বলে আজমুলের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন মেহেদী।
এমনকি কয়েক বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতেও অর্থ নেওয়া হয়েছিল। পরে আজমুল জানতে পারেন, তাকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়নি। এরপর তিনি নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন; কিন্তু মেহেদি হত্যায় জড়িত থাকতে পারেন, তা পরিবার প্রথমে ভাবেনি।
পরিবারের অভিযোগ, টাকা নিয়ে আজমুলের সঙ্গে মেহেদীর বিরোধ তৈরি হয়। ঘটনার আগের দিন চুয়াডাঙ্গায় থাকা আজমুলকে ফোন করে মেহেদী খুলনায় ডেকে নেন। এরপরই তাকে মেসে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিবারের ধারণা, ভুয়া ভর্তি ও অর্থ লেনদেনের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা থেকেই তাকে ডেকে আনা হয়ে থাকতে পারে। এই মেহেদীর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের।
গতকাল বুধবার ভবনটিতে গিয়ে দেখা গেছে, চার তলা ভবনের প্রতিটি তলায় আটটি করে কক্ষ রয়েছে। চতুর্থ তলায় ডি-৮ কক্ষে থাকতেন আজমুল। ভবনে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। প্রতিটি তলার প্রবেশদ্বারে তালাও নেই।
আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দীন জানান, চুয়াডাঙ্গায় ২০২৪ সালে এইচএসসি পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করতে ঢাকায় যায় আজমুল। সেখান থেকে খুলনায় আসে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিয়ে ভর্তির সুযোগ পায়নি। তিনি বলেন, ‘মেহেদীর সঙ্গে আমার ছেলে আজমুলের পরিচয় হয়। মেহেদী বলে চার বছর পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট দিয়ে দেবে। এ নিয়ে এক লাখ ২০ হাজার টাকার চুক্তি হয়। কেউ এটি জানলে আজমুলকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। তখন আজমুল ফোনে আমাকে জানায়, সে ভর্তির চান্স পেয়েছে। আমি ছেলেকে বিশ্বাস করে ভর্তির টাকা দেই।’ আর এই টাকা ফেরৎ চাওয়াই আমার ছেলেকে জীবন দিতে হলো।
ঘটনার বিচার চেয়ে খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব আ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ভাত খাওয়া নিয়ে হত্যাকান্ড ঘটনা মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। কাজেই এই মামলার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।
জানতে চাইলে খুলনা মেট্রোলিটন পুলিশের ডেপুটি পুলিম কমিশনার (সদর) এম এম শাকিলুজ্জামান বলেন, এটি একটি স্পর্শকাতর মামলা। আমরা তদন্ত করছি। ইতোমধ্যেই চারজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। আশাকরি অন্যান্য আসামিরা ধরা পড়বে।


