খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় ’২৪ হলের ছাত্রীদের ওয়াশরুমে গোপনে মুঠোফোন রেখে ভিডিও ধারণের অভিযোগে হল ক্যানটিনের এক কর্মচারীকে আটক করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে মারমুখী আচরণ এবং ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগে তার স্ত্রীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ক্যান্টিন কর্মী ইমাম হাসান ও তার স্ত্রী রূপামনিকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। এদের মধ্যে ক্যান্টিন কর্মী ইমাম হাসান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
এ ঘটনার পর ক্যান্টিনের বরাদ্দ বাতিল ও হলের কর্মচারীদের ভেতরে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আগামী ৩ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একাধিক সূত্র জানায়, বুধবার রাতে ওই হলের ছাত্রীদের ওয়াশরুমে গোপনে মোবাইল ফোন রেখে ভিডিও ধারণের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও ক্যাম্পাসে সার্বিক নিরাপত্তার দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জন করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি বিশ^বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও প্রশাসনিক কার্যালয়ে তালা দেয় বিক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীরা। ফলে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কেউ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেনি।
এদিকে ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও ক্যাম্পাসে সার্বিক নিরাপত্তার দাবিতে বৃহস্পতিবার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জন করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। একই দাবিতে ক্যাম্পাসে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের দাবি ইতিপূর্বে যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত দুইজন শিক্ষক ও অভিযুক্ত ক্যান্টিন কর্মীর বিচার না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন অব্যাহত থাকবে।
বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে বলে হরিণটানা থানার ওসি মো. হেলাল উদ্দিন জানান।
ওসি বলেন, অভিযুক্ত ইমাম হাসান পিটুনির শিকার হওয়ায় তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এছাড়া তার স্ত্রীকে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ক্যান্টিন কর্মী ইমাম হাসান ও তার স্ত্রী রূপামনিকে আজ বিকালে আদালতে প্রেরণ করা হয়। এদের মধ্যে ক্যান্টিন কর্মী ইমাম হাসান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।
ওসি বলেন, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ যে অভিযুক্ত ব্যক্তি গোপনে ছাত্রীদের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করার পর তার স্ত্রী ঘটনাস্থলে গিয়ে মারমুখী আচরণ করেন এবং ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ। এ কারণে তাকেও আটক করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিযোগ, অভিযুক্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে হলের ওয়াশরুমের ভেন্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে গোপনে ভিডিও ধারণ করতেন। পরে সেগুলো তিনি বিভিন্ন টেলিগ্রাম গ্রুপে ছড়িয়ে দিতেন। এ বিষয়ে তার জানতো তার স্ত্রীও।
বিক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ-বুধবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের গণরুম-সংলগ্ন ওয়াশরুমের ভেন্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে মুঠোফোন ব্যবহার করে এক ছাত্রীর ভিডিও ধারণের চেষ্টা করা হয়। বিষয়টি টের পেয়ে ওই ছাত্রী সহপাঠীদের জানান। খবর ছড়িয়ে পড়লে হলের বিভিন্ন ব্লকের আবাসিক শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে জড়ো হন।
বিষয়টি নিরাপত্তাকর্মীদের জানালে হলের ক্যান্টিনে কর্মরত ইমাম হাসান ও তার স্ত্রীকে আটক করা হয়। পরে হল প্রশাসন ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে এবং পুলিশকে খবর দেয়।
এ ঘটনাকে এবং সম্প্রতি ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির বিভিন্ন ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দিন শিক্ষার্থীরা। ফলে আজ বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ক্লাস হয়নি।
বিজয় ’২৪ হলের প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের নিরাপত্তার কথা বলে নানা বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। কিন্তু নিজের হলেই যদি নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে এসব বিধিনিষেধের অর্থ কী? আগেও ওই ব্যক্তির আচরণ নিয়ে অভিযোগ করা হয়েছিল, কিন্তু গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সহযোগী অধ্যাপক মো. তারেক বিন সালাম বলেন, অভিযুক্তকে আটক রাখা হয়েছে। মামলা দায়েরের বিষয়টি আলোচনা হচ্ছে। প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ছাত্রী হলের ক্যান্টিনে পুরুষ কর্মী নিয়োগের বিধান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অর্ডিন্যান্স দেখে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে হবে। এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষার্থীদের অন্দোলনের কারণে বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ ছিল।
জানতে চাইলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় ২৪ হলের প্রভোস্ট প্রফেসর ড. সেলিনা আহমেদ বলেন, হলের ক্যান্টিন পরিচালনাকারী গোপনে ওয়াশরুমের ভেন্টিলেশন দিয়ে মোবাইল ফোনে ভিডিও করার সময় শিক্ষার্থীরা তাকে আটক করে।
তিনি বলেন, খবর পেয়ে আমরা মোবাইল ফোনটি সিলগালা করে ভিডিও ধারণকারীকে আলামতসহ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছি। এছাড়া আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি ক্যান্টিনের বরাদ্দ বাতিল ও হলের কর্মচারীদের ভেতরে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৩ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে ছাড় দেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে- যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।


